(শেষ অংশ)
“ আমার শেষ কথাটা শোনো শংকর । আমার তখন প্রথম বয়েস , তুমি এসে পড়লে সেই নতুন-জাগা অরুণ রঙের মধ্যে , ডাক দিয়ে বাইরে আনলে যাকে তাকে নাও বা না নাও , নিজে তো তাকে পেলুম । আত্মপরিচয় ঘটল , বাস । দুই পক্ষের হয়ে গেল শোধবোধ । এখন দুইজনে অঋণী হয়ে আপন-আপন পথে চললুম , আর কী চাই । ” সোমশংকর থলিটা পকেটের মধ্যে পুরে গয়নাগুলো ফেলে দিলে পুকুরে । বাঁশরি দ্রুতপদে চলে গেল যেখানে বসে আছে পৃথ্বীশ । সকলেরই লক্ষ্যগোচর ভাবে বসল তার পাশে । প্রশ্রয় পেয়ে পৃথ্বীশ একটু ঝগড়ার সুরে বললে , “ এত দেরি করে এলে যে । ”
“ আমার শেষ কথাটা শোনো শংকর । আমার তখন প্রথম বয়েস , তুমি এসে পড়লে সেই নতুন-জাগা অরুণ রঙের মধ্যে , ডাক দিয়ে বাইরে আনলে যাকে তাকে নাও বা না নাও , নিজে তো তাকে পেলুম । আত্মপরিচয় ঘটল , বাস । দুই পক্ষের হয়ে গেল শোধবোধ । এখন দুইজনে অঋণী হয়ে আপন-আপন পথে চললুম , আর কী চাই । ” সোমশংকর থলিটা পকেটের মধ্যে পুরে গয়নাগুলো ফেলে দিলে পুকুরে । বাঁশরি দ্রুতপদে চলে গেল যেখানে বসে আছে পৃথ্বীশ । সকলেরই লক্ষ্যগোচর ভাবে বসল তার পাশে । প্রশ্রয় পেয়ে পৃথ্বীশ একটু ঝগড়ার সুরে বললে , “ এত দেরি করে এলে যে । ”

“ প্রমাণ করবার জন্যে যে বাঘ-ভাল্লুকের মধ্যে আসো নি । সবাই বলে উপন্যাসের নতুন পথ খুলেছ নিজের জোরে , আর এখানকার এই পুতুল নাচের মেলায় পথটা বের করতে ওফিস্যাল গাইড চাই , লোকে যে হাসবে । ”
“ পথ না পাই তো অন্তর গাইডকে তো পাওয়া গেল । ” এই বলে একটু ভাবের ঝোঁক দিয়ে ওর দিকে তাকালে ।
এই রকম আবিষ্ট অবস্থায় পৃথ্বীশের মুখের ভঙ্গি বাঁশরি সইতে পারত না । নিজেকে সামলে নিয়ে বললে , “ সস্তা মিষ্টান্নের কারবার শুরু করতে আজ ডাকি নি তোমাকে । সত্যি করে দেখতে শেখো , তার পরে সত্যি করে লিখতে শিখতে পারবে । অনেক মানুষ অনেক অমানুষ আছে চারি দিকে , ঠাহর করলেই চোখে পড়বে । ”
“ নেই বা দেখলুম , তোমার কী তাতে ? ”
“ লিখতে যে পারি নে পৃথ্বীশ । চোখে দেখি মনে বুঝি । ব্যর্থ হয় যে সব । ইতিহাসে বলে একদিন বাংলা দেশে কারিগরদের বুড়ো আঙুল কেটে দিয়েছিল । আমিও কারিগর , বিধাতা বুড়ো আঙুলটা কেটে দিয়েছেন । আমদানি করা মালে কাজ চালাতে হয় । সেটা কিন্তু সাচ্চা হওয়া চাই । ”
এমন সময় কাছে এল সুষমা ।
সুষমাকে দেখলে আশ্চর্য হতে হয় । সচরাচর এরকম চেহারা দেখা যায় না । লম্বা সতেজ সবল , সহজ মর্যাদায় সমুন্নত , রঙ যাকে বলে কনক গৌর , ফিকে চাঁপার মতো , কপাল নাক চিবুক স্পষ্ট করে যেন কুঁদে তোলা ।
সুষমা পৃথ্বীশকে একটা নমস্কার করে বাঁশরিকে বললে , “ বাঁশি কোণে লুকিয়ে কেন ? ”
“ কুনো সাহিত্যিককে বাইরে আনবার জন্যে । সম্প্রতি বেকার হওয়াতে এই দায়িত্বটা নিয়েছি — দিন কাটছে একরকম । খনির সোনাকে শানে চড়িয়ে নাম করতে পারব । পূর্ব হতেই হাতযশ আছে । জহরৎকে দামি করে তোলে জহরী , পরের ভোগের জন্যে । সুষী , ইনিই হচ্ছেন পৃথ্বীশবাবু জানো বোধহয় । ”
“ খুব জানি , এই সেদিন পড়ছিলুম , এঁর ‘ বোকার বুদ্ধি ' গল্পটা । কাগজে কেন এত গাল দিয়েছে বুঝতেই পারলুম না । ”
পৃথ্বীশ বললে , “ অর্থাৎ বইটা এমনিই কি ভালো । ”
“ ও-সব ধারালো কথা বলবার ভার বাঁশরির উপর । আমি সময় পেলে শুধু পড়ি , তার পরে বলতে কিছু সাহস হয় না , পাছে ধরা পড়ে কালচারের খাক্তি । ”
বাঁশরি বললে , “ বাংলার মানুষ সম্বন্ধে গল্পের ছাঁচে ন্যাচরল হিস্ট্রি লিখছেন পৃথ্বীশবাবু , যেখানটা জানেন না দগদগে রঙ দেন লেপে মোটা তুলি দিয়ে । রঙের আমদানি সমুদ্রের ওপার থেকে । দেখে দয়া হল । বললুম , জীবজন্তুর সাইকোলজির খোঁজে গুহা-গহ্বরে যেতে যদি খরচে না কুলোয় জুওলজিকালের খাঁচাগুলোর ফাঁক দিয়ে দৃষ্টিপাত করতে দোষ কী ? ”
“ তাই বুঝি এনেছ এখানে ? ”
“ পাপ মুখে বলব কী করে তা কবুল করছি । পৃথ্বীশবাবুর হাত পাকা , কিন্তু মালমসলাও তো পাকা হওয়া চাই । যতদূর সাধ্য , জোগান দেবার মজুরিগিরি করছি । এর পরে যে জিনিস বেরবে পৃথিবী চমকে উঠবে , নোবেল প্রাইজ কমিটি পর্যন্ত । ”
“ ততদিন অপেক্ষা করব । ইতিমধ্যে আমাদের ওদিকে চলুন । সবাই উৎসুক হয়ে আছে আপনার সঙ্গে আলাপ করবার জন্য । মেয়েরা অটোগ্রাফের খাতা নিয়ে ঘুরছে কাছে আসতে সাহস নেই । বাঁশি , একলা ওঁকে বেড়া দিয়ে রাখলে অনেকের অভিশাপ কুড়োতে হবে । ”
বাঁশরি উচ্চহাস্যে হেসে উঠল । “ সেই অভিশাপই তো মেয়েদের বর । সে তুমি জানো । রাজারা দেশ জয় করত ধন লুঠের জন্যে । মেয়েদের লুঠের মাল প্রতিবেশিনীদের ঈর্ষা । ” এ কথার উত্তর না দিয়ে সুষমা বললে , “ পৃথ্বীশবাবু , গন্ডি পেরোবার স্বাধীনতা যদি থাকে একবার যাবেন ওদিকটাতে ” – এই বলে চলে গেল ।
পৃথ্বীশ তখনি বলে উঠল , “ কী আশ্চর্য ওকে দেখতে । বাঙালি ঘরের মেয়ে বলে মনেই হয় না — যেন এথীনা , যেন মিনার্ভা , যেন ব্রূন্ হিল্ড । ”
উচ্চস্বরে হাসতে লাগল বাঁশরি । বলে উঠল , “ যত বড়ো দিগ্গজ পুরুষ হোক-না সবার মধ্যেই আছে আদিম যুগের বর্বর । নিজেকে হাড়পাকা রিয়ালিস্ট বলে দেমাক করো , ভান করো মন্তর মান না । এক পলকে লাগল মন্তর , উড়িয়ে নিয়ে গেল মাইথলজিক যুগে । মনটা তোমাদের রূপকথার , সেইজন্যেই কোমর বেঁধে কলমটাকে টেনে চলেছ উজানপথে । দুর্বল ব'লেই বলের এত বড়াই । ”
পৃথ্বীশ বললে , “ সে কথা মাথা হেঁট করে মানব , পুরুষ জাত দুর্বল জাত । ”
বাঁশরি বললে , “ তোমরা আবার রিয়ালিস্ট! রিয়ালিস্ট মেয়েরা । আমরা মন্তর মানি নে । যতবড়ো স্থূল পদার্থ হও , তোমরা যা , তোমাদের তাই বলেই জানি । রঙ আমরা মাখাই নে তোমাদের মুখে , মাখি নিজে । রূপকথার খোকা সব , মেয়েদের কাজ হয়েছে তোমাদের ভোলানো । পোড়া কপাল আমাদের । এথীনা , মিনার্ভা! হায় রে হায়! ওগো রিয়ালিস্ট , এটুকু বুঝতে পার না যে , রাস্তায় চলতে যাদের দেখেছ পানওয়ালির দোকানে এঁকেছ কড়া তুলিতে যাদের মূর্তি , তারাই সেজে বেড়াচ্ছে এথীনা , মিনার্ভা । ”
বাঁশরির ঝাঁঝ দেখে পৃথ্বীশ মনে মনে হাসলে । বললে , “ বৈদিক কালে ঋষিদের কাজ ছিল মন্তর পড়ে দেবতা ভোলানো ।– কিন্তু যাঁদের ভোলাতেন তাঁদের ভক্তি করতেন । তোমাদের যে সেই দশা দেখি বাঁশি । বোকা পুরুষদের ভোলাও তোমরা , আবার পাদোদক নিতেও ছাড় না , এমনি করে মাটি করলে এই জাতটাকে । ”
“ সত্যি সত্যি , খুব সত্যি! ওই বোকাদের আমরা বসাই উঁচু বেদীতে , চোখের জলে কাদামাখা পা ধুইয়ে দিই , নিজেদের অপমানের শেষ করি , যত ভোলাই তার চেয়ে হাজার গুণে ভুলি । ”
পৃথ্বীশ জিজ্ঞাসা করল , “ এর উপায় কী । ”
বাঁশরি বললে , “ তাই তো বলি অন্তত লেখবার বেলায় সত্যি কথাটা লেখো । আর মন্তর নয় মাইথলজি নয় । মিনার্ভার মুখোশটা খুলে একবার দেখো । সেজেগুজে পানের ছিপে ঠোঁট লাল করে তোমাদের পানওয়ালি যে মন্তরটা ছড়ায় , ওই আশ্চর্য মেয়েও ভাষা বদলিয়ে সেই মন্তরই ছড়াচ্ছে । সামনে পড়েছে পথচলতি এক রাজা , তাঁকে ভোলাতে বসেছে কিসের জন্যে ? টাকার জন্যে । শুনে রাখো , টাকা জিনিসটা মাইথলজি নয় , ওটা ব্যাঙ্কের । ওটা তোমাদের রিয়ালিজমের কোটায় । ”
পৃথ্বীশ বললে , “ টাকার প্রতি ওঁর দৃষ্টি আছে সেটাতে বুদ্ধির পরিচয় পওয়া গেল , সেইসঙ্গে হৃদয়টাও থাকতে পারে । ”
“ আছে গো আছে । ঠিক জায়গায় খুঁজে দেখলে দেখতে পাবে পানওয়ালিরও হৃদয় আছে , কিন্তু টাকা এক দিকে হৃদয়টা আর-এক দিকে । এইটে যখন আবিষ্কার করবে তখন গল্প জমবে । পাঠিকারা ঘোর আপত্তি করবে , বলবে মেয়েদের খেলো করা হল , অর্থাৎ তাদের মন্ত্রশক্তিতে বোকাদের মনে খট্কা লাগানো হচ্ছে । উঁচু দরের পুরুষ পাঠকেরা গালি পাড়বে , তাদের মাইথলজির রঙ চটিয়ে দেওয়া , সর্বনাশ । কিন্তু ভয় কোরো না পৃথ্বীশ , রঙ যখন যাবে জ্বলে , মন্ত্র যখন পড়বে চাপা — তখনো সত্য থাকবে টিকে । ”
“ ওর হৃদয়ের ঠিকানা জিজ্ঞাসা করতে পারি কি ? অসভ্যতা হবে , কিন্তু লেখক তো ড্রয়িংরুমের পোষা ভদ্রলোক নয় , সে অত্যন্ত আদিম শ্রেণীর সৃষ্টিকর্তা , চতুর্মুখের তুল্য কিংবা প্রলয়কর্তা দিগম্বরের স্বজাত । ”
“ ঠিকানা বলতে হবে না , নিজের চোখেই দেখতে পাবে চোখ যদি থাকে । এখন চলো ওইদিকে , তোমাকে নিয়ে ওদের মধ্যে প্রসাদ ভাগ করে দেই গে । ”
“ তোমার প্রসাদ ? ”
“ হ্যাঁ , আমারই প্রসাদ । আমার নিন্দে দিয়েই এর স্বাদটা হয়ে উঠেছে উপাদেয় । ”
“ দুঃখের কথা জানাই তোমাকে বাঁশরি । চাদরটাতে মস্ত একটা কালির দাগ । অন্যমনস্ক হয়ে দেখতে পাই নি । ”
“ এখানে কারো কাপড়ে কোনো দাগ নেই , তা দেখেছ ? ”
“ দেখেছি । ”
“ তা হলে জিত রইল একা তোমারই । তুমি রিয়ালিস্ট , ওই কালির দাগ তোমার ভূষণ । আজও খাঁটি হয়ে ওঠনি বলেই এতক্ষণ লজ্জা করছিলে । ”
“ তুমি আমাকে খাঁটি করে তুলবে ? ”
“ হাঁ , তুলব , যদি সম্ভব হয় । ”
বাঁশরির প্রত্যেক কথায় পৃথ্বীশের মনটা যেন চুমুকে মদ খাচ্ছে । এই দলের মেয়ের সঙ্গে এই ওর প্রথম আলাপ । অপরিচিতের অভিজ্ঞতায় মনটা পথ হাতড়িয়ে বেড়াচ্ছে পদে পদে । কোন্ কথাটা পৌঁছোয় কোন্ অর্থ পর্যন্ত , কতদূর পা বাড়ালে পড়বে না গর্তের মধ্যে সম্পূর্ণ ঠাহর করে উঠতে পারছে না ।
এই অনিশ্চয়তা মনকে উদ্ভ্রান্ত করে রেখেছে দিনরাত । যে কথার যে উত্তর দেয় নি বাড়িতে ফিরে এসে সেইটে ও বাজাতে থাকে , ঠিক সময় কেন মনে আসে নি ভেবে হায় হায় করে । বাঁশরি ওকে অনেকটা প্রশ্রয় দিয়েছে , তবু পৃথ্বীশ বিষম ভয় করে তাকে । নিজেকে ধিক্কার দিয়ে বলে সাহসী পুরুষের স্পর্ধাকেই পুরস্কৃত করে মেয়েরা , যারা ওদের সসংকোচে পথ ছেড়ে দেয় , বঞ্চিত হয় তারাই । নিজের দৃঢ় বিশ্বাস , ওর গোঁয়ার্তুমি যদি হত খাঁটি গিনি সোনার দরের , বাজালে ঠন্ করে উঠত , তা হলে মেয়ে মহলে উড়ত ওর জয়-পতাকা । পুরুষের উপকরণে বিভীষিকা বীভৎসতার দাম আছে ওদের কাছে ।
পৃথ্বীশ স্পষ্ট বুঝেছে যে , নিজেদের সমাজের উপর বাঁশরির জোর দখল । ওকে সবাই যে ভালোবাসে তা নয় , কিন্তু তুচ্ছ করবার শক্তি নেই কারো । তাই সে যখন স্বয়ং পৃথ্বীশকে পাশে করে নিয়ে চলল আসরের মধ্যে , পৃথ্বীশ তখন মাথাটা তুলেই চলতে পারলে , যদিও লক্ষ্মীছাড়া এন্ডিচাদরের কালির লাঞ্ছনা মন থেকে সম্পূর্ণ ঘোচে নি ।
জনতার কেন্দ্রস্থলে এসে পৌঁছল , কিন্তু ওর উপর থেকে সমবেত সকলের লক্ষ্য তখন গেছে সরে ।
সবেমাত্র উপস্থিত হয়েছে আর-একটি লোক তার উপরে মন না দিয়ে চলে না ।
সোমশংকর তার কাছে বিনয়াবনত , সুষমার দেহমন ভক্তিতে আবিষ্ট । অন্য সকলে কীভাবে ওকে অভ্যর্থনা করবে স্থির করতে পারছে না , ভক্তি দেখাতেও সংকোচ , না দেখাতেও লজ্জা । দেহের দৈর্ঘ্য মাঝারি আয়তনের চেয়ে কিছু বড়ো , মনে হয় চারি দিকের সকলের থেকে পৃথক তার ঋজু সুদৃঢ় শরীর , যেন ওকে ঘিরে আছে একটা সূক্ষ্ম ভৌতিক পরিবেষ্টন । ললাট অসামান্য উন্নত , জ্বলজ্বল করছে দুই চোখ , ঠোঁটে রয়েছে অনুচ্চারিত অনুশাসন , মুখের রঙ পান্ডুর স্বচ্ছশ্যাম , অন্তর থেকে বিচ্ছুরিত দীপ্তিতে ধৌত । দাড়িগোঁফ কামানো , সুডৌল মাথায় ছোটো করে ছাঁটা চুল , পায়ে নেই জুতো , তসরের ধুতিপরা , গায়ে খয়েরি রঙের ঢিলে জামা ।
নাম মুক্তারাম শর্মা ; সকলেরই বিশ্বাস আসল নাম ওটা নয় । পরিচয় জিজ্ঞাসা করলে ঈষৎ হেসে শান্ত হয়ে থাকে , তা নিয়ে কল্পনা করে নানা লোকে নানা প্রকার , কোনোটা অদ্ভুত অপ্রাকৃত , কোনোটা কুৎসায় কটু । ওর শিক্ষা য়ুরোপে এইরকম জনশ্রুতি — নিশ্চিত প্রমাণ নেই । কলেজের ছেলেরা অনেকে ওর কাছে আসে পড়া নেবার জন্যে , তাদের বিশ্বাস পরীক্ষায় উতরিয়ে দিতে ওর মতো কেউ নেই , অথচ কলেজি শিক্ষার 'পরে ওর নিরতিশয় অবজ্ঞা । এই শেখাবার উপলক্ষ করে ছেলেদের উপর ওর প্রভাব পড়ছে ছড়িয়ে । এমন একদল আছে যারা ওর জন্য প্রাণ দিতে পারে । এই ছেলেদের ভিতর থেকে বাছাই ক'রে ও একটি অন্তরঙ্গ চক্র তৈরি করেছে কি না কে জানে — হয়তো করেছে । ছুটির সময় একদলকে সঙ্গে নিয়ে ও ভ্রমণ করতে যায় দূর প্রদেশে , দেখা যায় সব জায়গাতেই ওর পরিচিত ভক্ত , তাদের ভাষাও ওর জানা ।
সুষমা যখন প্রথম কলেজে প্রবেশ করেছে তখন মুক্তারামের কাছে ওর পাঠ আরম্ভ । বাঁধা পাঠ্য বইটাকে গৌণ করে শিক্ষক পড়িয়েছে আপন মত অনুসারে নানা বিষয়ের বই ।
ছুটির সময় যথাযোগ্য স্থানে নিয়ে গিয়ে ওকে ছুরি খেলতে , ঘোড়ায় চড়তে , ডিঙি নৌকো দুহাতে দাঁড় ধরে বাইতে করেছে পটু , মোটর গাড়ির কলের তত্ত্ব , চালানোর কৌশল নিপুণ করে শিখিয়েছে ।
সুষমার বিধবা মা ব্রাহ্মসমাজের মেয়ে । এনগেজমেন্টের অনুষ্ঠান ব্রাহ্মমতে উপাসনা করে হয় এই তার ছিল ইচ্ছে । সুষমা জিদ করে ধরে পড়ল অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে হবে মুক্তারামকে দিয়ে । মুক্তারামের কোন্ সম্প্রদায় কেউ জানে না , ব্রাহ্মসমাজে তার গতিবিধি নেই , আর অচরণ নয় নিষ্ঠাবান হিন্দুর মতো । সুষমার মা বিভাসিনী গভীর ভক্তি করে মুক্তারামকে , তবু তার ইচ্ছা ছিল সমাজের লোক দিয়েই ক্রিয়াটা নিষ্পন্ন হয় । সুষমা কোনোমতেই রাজী হল না । আজ মুক্তারামের আহ্বান এখানে সেই কারণেই ।
মুক্তারামকে সবাই সংকোচ করে , বাঁশরি করে না । সে এসেই একটি ছোটরকম নমস্কার করে বললে , “ সুষমার মাস্টরিতে আজ শেষ ইস্তফা দিতে এসেছেন ?”
“ কেন দেব ? আরো একটি ছাত্র বাড়ল । ”
বাঁশরি সোমশংকরের দিকে তীব্র কটাক্ষ হেনে বললে , “ তাকে মুগ্ধবোধের পাঠ শুরু করাবেন ? ওই দেখুন-না , মুগ্ধতার তলায় ডুবেছে মানুষটা , হঠাৎ ওর বোধোদয় কোনোদিন হয় যদি সেদিন ডাক্তার ডাকতে হবে । ” মুক্তারাম কোনো উত্তর না করে বাঁশরির মুখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকালে । নীরবে জানালে একে বলে ধৃষ্টতা । বাঁশরির মতো মেয়েও কুন্ঠিত হল এই দৃষ্টিপাতে ।
স্বল্পজলা নদীর স্রোতঃপথ প্রশস্ত হয়ে এখানে-ওখানে চর পড়ে যেরকম দৃশ্যটা হয় সেইরকম চেহারা বিভাসিনীর । শিথিল প্রসারিত হয়েছে দেহ , কিছু মাংসবাহুল্য ঘটেছে তবু চাপা পড়ে নি যৌবনের ধারা । তার সৌন্দর্য স্বীকার করতে হয় আজও । পতিকুলে মেয়েটি ছাড়া আর কেউ নেই তার , স্বামীর দত্ত সম্পত্তি থেকে সংসারের অভাব সহজেই পূরণ হয়ে আরো কিছু হাতে থাকে । কন্যার ভবিষ্যৎ লক্ষ করে সেই টাকা এতদিন সঞ্চিত হয়েছে বিশেষ যত্নে । সোমশংকরের সঙ্গে মেয়ের বিবাহ প্রস্তাবের পর থেকে সেই দায়িত্বের টান এসেছে আলগা হয়ে ।
এই বিবাহ যে হতে পারে এ ছিল অভাবনীয় । সবাই জানত রাজকুমার সম্পূর্ণ বাঁশরির প্রভাবের অধীনে , কেউ যে তার নাগাল পেতে পারে এ কথা মনে হত অসম্ভব । কিন্তু সেসময় বেঁচে ছিল পূর্বতন রাজা প্রভুশংকর , বাঁশরির সঙ্গে সোমশংকরের বিবাহের প্রধান বাধা । অল্পদিন হল পিতার মৃত্যু হয়েছে । তবু জাতের বাধা কাটতে চায় না । ক্ষত্রিয়বংশের বাইরে রাজার বিবাহ প্রস্তাবে প্রজারা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে । এমন সময়ে মুক্তারাম এই সম্বন্ধ পাকা করলেন কী করে সেই এক কাহিনী ।
বিভাসিনী এসে সংবাদ দিল , সময় উপস্থিত । ঘরের ভিতরে বেদি রচনা করে সভার স্থান হয়েছে । নিমন্ত্রিতেরা সবাই চলল সেইদিকে । বাঁশরির নিমন্ত্রণ হয় নি , তা ছাড়া কন্যাপক্ষের ইচ্ছে ছিল না সে উপস্থিত থাকে । বাঁশরি এসেছে ভদ্ররীতি এবং ভদ্রসমাজকে উপেক্ষা ক'রে । তার দৃঢ় পণ সে থাকবে অনুষ্ঠান-সভার মধ্যেই । কেউ-বা হাসবে , কেউ-বা রাগবে , কিন্তু কিসের কেয়ার করে সে । মনকে শক্ত করে মাথা তুলে পা বাড়াচ্ছিল ঘরের মধ্যে , পা গেল কেঁপে , বোধ করি চোখে আসছিল জল , পারলে না ঘরে যেতে , আটকে রইল বাইরে ।
পৃথ্বীশ জিজ্ঞাসা করলে , “ ঘরে যাবে না ?”
বাঁশরি বললে । “ না , সস্তাদামের সদুপদেশ শুনলে গায়ে জ্বর আসে । ”
“ সদুপদেশ! ”
“ হাঁ , উপদেষ্টার শিকারের এই তো সময় , যাকে বলে সুবর্ণ সুযোগ । পায়ে দড়ি-বাঁধা জীবের 'পরে নিঃশেষ করে দেয়
শব্দভেদী বাণের তূণ , সঙ্গে সঙ্গে দুঃখ পায় আহূত-রবাহূতের দল । ”
“ আমি একবার দেখে আসি-না । ”
“ না , শোনো , একটা প্রশ্ন আছে । সাহিত্য-সম্রাট , গল্পটার মজ্জা যেখানে সেখানে পৌঁচেছে তোমার দৃষ্টি ? ”
“ আমার হয়েছে অন্ধগোলাঙ্গুলন্যায় । লেজটা ধরেছি চেপে বাকিটা টান মেরেছে আমাকে , সমস্ত চেহারাটা পাচ্ছি নে । মোট কথাটা বুঝছি সুষমা বিয়ে করবে রাজাবাহাদুরকে , পাবে ঐশ্বর্য , তার বদলে হাতটা দিতে প্রস্তুত হৃদয়টা নয় । ”
“ শোনো , বলি , সোমশংকর নয় প্রধান নায়ক এ কথা মনে রেখো । ”
“ তাই না কি । তা হলে অন্তত গল্পের ঘাট পর্যন্ত এগিয়ে দাও , তার পরে সাঁতরে হোক খেয়া ধরে হোক পারে পৌঁছব । ”
“ এ খবরটা বোধ হয় আগে থাকতেই জান , যে , মুক্তারাম তরুণসমাজে বিনামাইনের মাস্টারি করে থাকেন , বাছাই করে নেন ছাত্র । ছাত্রী পেতে পারতেন অসংখ্য — কিন্তু তাদের সম্বন্ধে বাছাই করার রীতি এত কড়া যে এতদিনে একটিমাত্র পেয়েছেন , তারই নাম সুষমা সেন । ”
“ যাদের ত্যাগ করেছেন তাদের কী দশা! ”
“ তাদের মধ্যে আত্মহত্যার সংখ্যা কত , খবর পাই নি । কিন্তু এ জানি , তাদের আনেকেই চক্ষু মেলে চাঁদের পানে তাকিয়ে থাকে । ”
“ সেই চকোরীর দলে তুমি নাম লেখাও নি বাঁশি ?”
“ তোমার কী মনে হয় ? ”
“ আমার মনে হয় চকোরী নও , তুমি মিসেস রাহুর পদ পাবার উমেদার । তুমি যাকে নেবে তাকে আগাগোড়া দেবে আত্মসাৎ করে , চক্ষু মেলে চেয়ে থাকা নয় । ”
“ ধন্য! ‘ সাধু ', চরিত্রচিত্রে তুমি হবে বাংলাদেশে প্রথমশ্রেণীর প্রথম । গোল্ডমেডালিস্ট । লোকমুখে শোনা যায় মেয়েদের স্বভাবের রহস্য ভেদ করতে হার মানেন মেয়েদের সৃষ্টিকর্তা পর্যন্ত — তোমার দৃষ্টি দেখছি কোনো বাধা মানে না । ”
হাতজোর করে পৃথ্বীশ — বললে , “ বন্দনা সারা হল , এবার পালা শুরু করো । ”
“ এটা কি এখনো আন্দাজ করতে পার নি যে , সুষমা ওই মুক্তারাম সন্ন্যাসীর ভালোবাসায় একেবারে শেষ পর্যন্ত তলিয়ে গিয়েছে । ”
“ ভালোবাসা না ভক্তি ? ”
“ চরিত্রবিশারদ , এখনো জান না , মেয়েদের যে ভালোবাসা ভক্তিতে পৌঁছয় সেটা তাদের মহাপ্রয়াণ । তার থেকে ফেরবার রাস্তা নেই । মেয়েদের মায়ায় অভিভূত হয়ে সমানক্ষেত্রে যারা ধরা দিয়েছে তারা কেনে ইন্টারমিডিয়েটের টিকিট , কেউ-বা থার্ডক্লাসের । মেয়েদের কাছে হার মানল না যে , ওদের ভুজপাশের দিগ্বলয় এড়িয়ে যে উঠল মধ্য গগনে , দুই জোড়হাত উপরে তুলে তাকেই দিলে মেয়েরা আপন শ্রেষ্ঠদান । দেখ নি কী সন্ন্যাসী যেখানে সেখানে মেয়েদের কী ভিড় । ”
“ আচ্ছা , মানছি তা , কিন্তু উল্টোটাও দেখেছি । মেয়েদের বিষম টান বর্বরের দিকে , তাদের কঠোরতম অপমানে ওরা পুলকিত হয়ে ওঠে , পিছন পিছন রসাতল পর্যন্ত যেতে হয় রাজি । ”
“ তার কারণ মেয়েরা অভিসারিকার জাত , এগিয়ে গিয়ে যাকে চাইতে হয় তার দিকেই ওদের ভালোবাসা । উপেক্ষা তারই 'পরে দুর্বৃত্ত হবার মতো জোর নেই যার কিংবা দুর্লভ হবার মতো তপস্যা । ”
“ বুঝলুম , ওই সন্ন্যাসীকে ভালোবেসেছে সুষমা । ”
“ কী ভালোবাসা । মরণের বাড়া । কোনো সংকোচ ছিল না । কেননা ঠাউরেছিল একেই বলে ভক্তি । মাঝে মাঝে মুক্তারামকে দূরে যেতে হত কাজে , তখন সুষমা শুকিয়ে যেত , মুখ হয়ে যেত ফ্যাকাসে , চোখে প্রকাশ পেত জ্বালা , মন শূন্যে শূন্যে খুঁজে বেড়াত কার দর্শন , পড়াশুনোতে মন দেওয়া হত অসম্ভব । বিষম ভাবনা হল মায়ের মনে । একদিন আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন , “ বাঁশি , কী করি । ” আমার বুদ্ধির উপর বিশ্বাস ছিল তখনো । আমি বললেম , “ মুক্তারামের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দাও । ” শুনে আঁৎকে উঠে বললেন , “ এমন কথা ভাবতে পার কী করে । ” তর্ক না করে নিজেই চলে গেলুম মুক্তারামের কাছে । সোজা বললেম , “ নিশ্চয় জানেন , সুষমা আপনাকে অসম্ভবরকম ভালোবাসে , তাকে বিয়ে করে উদ্ধার করুন বিপদ থেকে । ” এমন করে তাকালেন মুখের দিকে , আমার রক্তচলাচল গেল থেমে ।
গম্ভীর সুরে বললেন , “ সুষমা আমার ছাত্রী , তার ভার আমার উপরে , তা ছাড়া আমার ভার তোমার উপরে নেই । ” পুরুষের কাছে এত বড়ো ধাক্কা আমার জীবনে এই প্রথম । ধারণা ছিল সব পুরুষের 'পরেই সব মেয়ের আবদার চলে যদি সাহস থাকে আবদার করবার । দেখলেম দুর্ভেদ্য দুর্গ আছে , মেয়েদের সাংঘাতিক বিপদ সেই রুদ্ধদ্বারের সামনে । এর পরের অধ্যায়ের বিবরণ পাওয়া যায় একখানা চিঠি থেকে , তার কপি দেখাব তোমার শিক্ষার্থে । ”
এমন সময়ে যে-ঘরে সভা বসেছিল সেখানে কোন্ এক জানলা থেকে অপরাহ্ন-সূর্যের রশ্মি বাঁকা হয়ে পড়ল ঠিক সুষমার মুখে । দূর থেকে বাঁশরি দেখতে পেলে উপদেশের এক অংশে মুক্তারাম বর-কনের পরস্পর আঙটিবদল উপলক্ষে সুষমার আঙুল থেকে আঙটি খুলে নিয়ে সোমশংকরের আঙুলে পরাচ্ছে । সুষমা পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ , শান্ত তার মুখ , দুই চোখ দিয়ে ঝরঝর [করে] পড়ছে জল ।
বাঁশরি বললে , “ মুক্তারামের মুখখানা একবার দেখো । ওই যে সূর্যের আলো এসে পড়েছে তার বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব যেমন লক্ষ যোজন মাইল দূরে , ওই মেয়েটার মনে যে অগ্নিকান্ড চলছে তার সঙ্গে সম্পর্ক নেই অথচ তাকে নিয়ে উজ্জ্বল ছবি বানিয়ে তুললে , মুক্তরামও নিজের মধ্যে যে তত্ত্বটা নিয়ে আছে সে ওই মেয়েটার মর্মান্তিক বেদনা থেকে বহুদূরে , তবু নিষ্ঠুর রেখায় ফুটিয়ে তুললে নাটকটাকে । ”
পৃথ্বীশ জিজ্ঞাসা করলে , “ সুষমার প্রতি সন্ন্যাসীর মন সত্যিই এতই যদি নির্লিপ্ত হবে ওকে অমন করে বেছে নিলে কেন ? ”
“ আইডিয়ালিস্ট! বাস্ রে ওদের মতো ভয়ংকর নির্মম জীব নেই জগতে । আফ্রিকার অসভ্য মারে মানুষকে নিজে খাবে বলে । এরা মারে তার চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যায় , নিজে খায় না ক্ষিধে পেলেও , সারে সারে নরবলি দেয় আইডিয়ার কাছে । জেঙ্গিস খাঁর চেয়ে সর্বনেশে । ”
“ বাঁশি , সন্ন্যাসীর 'পরে তোমার মনোভাবে কোনো রস দেখছি না তো । করুণা নয় , ভক্তি তো নয়ই । ”
“ ভক্তি করবার মেয়ে নই গো আমি! মেয়েদের পরমশত্রু ওই মানুষটা । রাজরানী যদি হতুম মেয়েদের চুলে দড়ি পাকিয়ে ওকে দিতুম ফাঁসি । কামিনীকাঞ্চন ও ছোঁয় না তা নয় কিন্তু তাকে দেয় ফেলে ওর কোন্ এক জগন্নাথের রথের তলায় , বুকের পাঁজর যায় গুঁড়িয়ে । ”
“ ওর আইডিয়াটা কী জানা চাই তো । ”
“ সন্ধান পাওয়া শক্ত । ওর এক শিষ্যকে জানি , তার রস সম্পূর্ণ শুকিয়ে যায় নি , ডাক দিলে খুশি হয়ে আসে কাছে । সেই মুগ্ধের মুখ থেকে খবর আদায় করেছিলুম । ‘ তরুণ তাপস সংঘ ' নামে মুক্তারাম এক সংঘ বানিয়েছে । বাছা বাছা ছেলেদের পুরোপুরি মানুষ করে তোলবার ব্রত ওর । তার পরে বীজবপনের নিয়মে সমস্ত ভারতবর্ষময় দেবে তাদের ছড়িয়ে । ”
“ কিন্তু তরুণী ? ”
“ একেবারে বিবর্জিতা । ”
“ তা হলে সুষমাকে কিসের প্রয়োজন ? ”
“ অন্ন চাই যে । ব্রহ্মচারীকেও ভিক্ষার জন্য আসতে হয় মেয়েদের দ্বারে । রাজভান্ডারের চাবি দিতে চান ওর হাতে । রোসো অনুষ্ঠানটা শেষ হয়ে আসছে , এইবার ঘরে ঢুকে দেখে আসি গে । ”
গেল ঘরের মধ্যে । তখন মুক্তারাম বলছে , “ তোমরা যে সম্বন্ধ স্বীকার করছ , জেনো , সে আত্মপ্রকাশের জন্যে , আত্মবিলোপের জন্যে নয় । যে-সম্বন্ধ মুক্তির দিকে নিয়ে চলে তাকেই শ্রদ্ধা করি , যা বেঁধে রাখে পশুর মতো তা প্রকৃতির হাতে গড়া প্রবৃত্তির শিকলই হোক আর মানুষের কারখানায় গড়া দাসত্বের শিকলই হোক — ধিক্ তাকে । ”
উজ্জ্বল হয়ে উঠল সুষমার মুখ , যেন সে দৈববাণী শুনলে । মুক্তারামের পায়ে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করলে ।
চৌরঙ্গি অঞ্চলে বাঁশরিদের বাড়ি । সেখানে ওর দুই অবিবাহিত ভাই থাকে । পাটনা অঞ্চলে থাকতে হয় বাপকে বেহার গবর্মেন্টের কোন্ কাজে । মা প্রায়ই থাকে তারই সঙ্গে , মেয়েকে রাখতে চায় কাছে , মেয়ে কলকাতা ছেড়ে যেতে নারাজ ।
পৃথ্বীশকে বাঁশরি এত প্রশ্রয় দেয় , সেটা একেবারেই পছন্দ করে না ভাইরা । সবাই জানে বাঁশরির বুদ্ধি অসামান্য তীক্ষ্ণ , মেয়েদের দিক থেকে সেটা একেবারেই আরামের নয় , তা ছাড়া ওর অধিকাংশ সংকল্প দুঃসাহসিক হিংস্র প্রাণীর মতো , শুধু যে লম্বা লাফ দিতে পারে তা নয় , সঙ্গে থাকে প্রচ্ছন্ন কোষে তীক্ষ্ণ নখর । ওর ভাইরা সুযোগ পেলেই পৃথ্বীশের চেহারা নিয়ে , লেখা নিয়ে ঠাট্টা করে , কিন্তু এ বাড়িতে যাতায়াতের বাধা দেবার আভাসমাত্র দিতে সাহস পায় না ।
পৃথ্বীশ জানে এদের ঘরে তার প্রবেশ অনভিলষিত । তাই নিয়ে ওখানকার দ্বারী থেকে আরম্ভ করে সমস্ত পুরুষ অধিবাসীর কাছে ওর সংকোচ ভাঙতে চায় না — ও কেবলই মনে করে , ওর আদ্যোপান্ত সমালোচনা করে সবাই , বিশেষত কপালের সেই দাগটার । এদের বাড়িতে অন্য যে-সব অভ্যাগতদের আসতে দেখে , তারা সাজে সজ্জায় ভাবে ভঙ্গিতে ওর থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র শ্রেণীর মানুষ । ও চেষ্টা করে নিজেকে বোঝাতে যে ওরা ডেকোরেটেড ফুল্স্ , কিন্তু সেই স্বগতোক্তিতে লজ্জা চাপা পড়ে না । ও যখন দেখে অন্যরা এখানে আসে স্বাধিকারের নিঃসংকোচে তখন আপন সাহিত্যিক আভিজাত্যবোধকে মনে মনে সবলে স্ফীত করে তুলেও নিজেকে ওদের সমান বহরে দাঁড় করাতে পারে না । সেটা বোঝে বাঁশরি এবং এও বোঝে যে বাঁশরির দিকে ওর আকর্ষণ প্রতিদিন প্রবল হয়ে উঠছে অন্তত তার একটা কারণ এই শ্রেণীগত দুরধিগম্যতা । বাঁশরির সামীপ্যে ওর মনে একটা অহংকার জাগে , ইচ্ছে করে দেখুক সব বাইরের লোকে । এই অহংকারটা ওর পক্ষে লজ্জার কারণ । তা জেনেও পারে না সামলাতে । একটা কথা বুঝে নিয়েছে বাঁশরি যে , ওদের বাড়িতে হেঁটে আসতে বাধে পৃথ্বীশের । যখন দরকার হয় নিজের গাড়ি পাঠিয়ে দেয় ওকে আনতে । অর্থাভাবগ্রস্ত পৃথ্বীশ শোফারকে মোটা বকশিস দিতে ভোলে না ।
আজ শৌখিনমন্ডলীর দিনারম্ভে অর্থাৎ বেলা আটটায় গাড়ি পাঠিয়েছিল বাঁশরি । সেদিন পৃথ্বীশের হল অকালবোধন । তারও দিনগণনা হয় পূর্বাহ্নের প্রথম কটা ঘন্টা বাদ দিয়ে । বাঁশরির ভাইরা তখন বিছানায় শুয়ে আধ-মেলা চোখে চা খাচ্ছে । সূর্যের যেমন অরুণ সারথি , ওদের জাগরণের তেমনি অগ্রদূত গরম চায়ের পেয়লা । পৃথ্বীশ যখন এল বাঁশরির চুলবাঁধা তখন শিথিল , মুখ ফ্যাকাসে , আটপৌরে শাড়ি , পায়ে ঘাসের জাপানি চটি । মুগ্ধ হল পৃথ্বীশের মন , অসজ্জিত রূপের মধ্যে অন্তরঙ্গতা আছে , তাতে দুরু দুরু কাঁপিয়ে দিল ওর বুকের ভিতরটা । ইচ্ছে করতে লাগল মরীয়া হয়ে দুঃসাহসিক কথা একটা কিছু বলে ফেলে । মুখে বেধে গেল , শুধু বললে , “ বাঁশি , আজ তোমাকে দেখাচ্ছে সকালবেলাকার অলস চাঁদের মতো । ”
বাঁশরির স্পষ্ট করে বলতে ইচ্ছে করছিল ‘অকরুণ বিধাতার শাপ তোমার মুখে । মুগ্ধ দৃষ্টি তোমাকে মানায় না । দোহাই তোমার , গদগদ ভাবটা রেখে দিয়ো আপন নির্জন ঘরের বিরহের জন্য জমিয়ে। ' পৃথ্বীশের মুখের 'পর চোখ রাখা বাঁশরির পক্ষে অনেক সময় অসম্ভব , বিশেষত যখন সেই মুখে কোনো আবেগের তরঙ্গ খেলে , হয় দুর্নিবার হাসি পায় , নয় ওকে পীড়িত করে ।
পৃথ্বীশের ভাবোচ্ছাস থামিয়ে দিয়ে বাঁশরি বললে , “ কাজের কথার জন্যে ডেকেছি , অন্য অবান্তর কথার প্রবেশ স্ট্রিক্টলি প্রোহিবিটেড । ”
পৃথ্বীশ ক্ষুণ্ন হয়ে বললে , “ জরুরি কথা এত কী আছে । ”
“ জরুরি নয়! এই বুঝি তুমি আর্টিস্ট । নিজের চক্ষে দেখলে আসন্ন ট্র্যাজেডির প্রলয় সংকেত । এখনো রঙের তুলি বাগিয়ে ধরতে মন ছট্ফট্ করছে না ? আমার তো কাল সারারাত ঘুম হল না । কী বলব , বিধাতা শক্তি দেন নি নইলে এমন কিছু বলতুম যার অক্ষরে অক্ষরে উঠত আগুনের ফোয়ারা । আর্টিস্টের মতো দেখতে পাচ্ছি সমস্তটাই স্পষ্ট , অথচ আর্টিস্টের মতো বলতে পারছি না স্পষ্ট করে । চতুর্মুখ যদি বোবা হতেন তা হলে অসৃষ্ট বিশ্বের ব্যাথায় মহাকাশের বুক যেত ফেটে । ”
“ বাঁশি , কে বলে তুমি প্রকাশ করতে পার না ? কে বলে তুমি নও পুরো আর্টিস্ট ? তোমার শক্তির যে-সব প্রমাণ মুখে-মুখে যেখানে-সেখানে হরির লুটের মতো ছড়িয়ে ফেলো দেখে আমার ঈর্ষা হয় । ”
“ আমি যে মেয়ে , আমার প্রকাশ ব্যক্তিগত । বলবার লোক স্পষ্ট সামনে পেলে তবেই বলতে পারি । কেউ নেই অথচ বলা আছে এইটে পুরুষ আর্টিস্টের । সেই বলা চিরকালের — আমাদের বলা যত হোক সে কেবল নগদ বিদায় দিনেদিনের । ঘরে ঘরে মুহূর্তে মুহূর্তে সে বুদ্বুদের মতো উঠছে আর মেলাচ্ছে । ”
পুরুষ আর্টিস্টের অহংকার ঘনিয়ে উঠল , সে বললে , “ আচ্ছা বেশ , কাজ শুরু হোক । কাল বলেছিলে একটা চিঠির কথা । ”
“ এই নাও” , ব'লে একটা চিঠির কপি করা এক অংশ ওকে পড়তে দিলে । তাতে আছে — “ প্রেমে মানুষের মুক্তি । কবিরা যাকে ভালোবাসা বলে সেটা বন্ধন । তাতে একজন মানুষকে আসক্তির দ্বারা বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে তাকেই তীব্র স্বাতন্ত্র্যে অতিকৃত করে তোলে । যত তার দাম প্রকৃতিজুয়ারি তার চেয়ে অনেক বেশি ঠকিয়ে আদায় করে । এই তো প্রকৃতির চাতুরি , নিজের উদ্দেশ্য সাধনের জন্যে । মোহের জাদু লাগিয়ে এই মরীচিকার সৃষ্টি । এই কথাটাকেই শেক্সপিয়ার কৌতুকচ্ছলে দেখিয়েছেন তাঁর ভরাবসন্তের স্বপ্নে । প্রেম জাগ্রত দৃষ্টি , নরনারীর ভালোবাসা স্বপ্নদৃষ্টি নেশার ঘোরে । প্রকৃতি মদ ঢেলে দেয় দেহের পাত্রে , তাতে যে অনুভূতিকে তীব্র করে , তাকে সহজ সত্যবোধের চেয়ে বেশি সত্য বলে ভুল হয় । এই ভোলানোটা প্রকৃতির স্বরচিত । খাঁচাকেও পাখি ভালোবাসে যদি তাকে আফিমের নেশায় বশ করা যায় । বন্ধনের প্রতি আসক্তিকে সর্বান্তঃকরণে ভয় করো , জেনো ওটা সত্য নয় । সংসারে যত দুঃখ , যত বিরোধ সকলের মূল এই ভ্রান্তি নিয়ে , যে ভ্রান্তি শিকলকে মূল্যবান করে দেখায় । কোন্টা সত্য কোন্টা মিথ্যে যদি চিনতে চাও , তবে বিচার করলেই বুঝতে পারবে কোন্টাতে মুক্তি দেয় , কোন্টাতে দেয় না । প্রেমে মুক্তি , আসক্তিতে বন্ধন । ”
“ চিঠি পড়লুম । তার পরে ?” “ তারপরে তোমার মাথা , অর্থাৎ কল্পনা । মনে মনে শুনতে পাচ্ছ না , শিষ্যকে বলছেন সন্ন্যাসী — ভালোবাসা আমাকেও না , ভালোবাসা আর কাউকেও না । নির্বিশেষ প্রেম , নির্বিকার আনন্দ , নিরাপদ আত্মনিবেদন , এই হল দীক্ষামন্ত্র । ”
“ তা হলে এর মধ্যে সোমশংকর আসে কোথা থেকে ?”
সেই রাস্তাই তো তৈরি হল প্রেমে । সন্ন্যাসী বলেছেন প্রেমে সকলেরই অধিকার । সোমশংকরের তাতে পেট ভরবে না , সে চেয়েছিল বিশেষ প্রেম , মীনলাঞ্ছনের মার্কা মারা । কিন্তু সর্বনাশে সমুৎপন্নে যথালাভ , অর্ধেকের চেয়ে কম হলেও চলে । আমি তোমাকে বলে দিচ্ছি , সুষমা ওকে খুব গম্ভীর সুরে বলেছিল , যে-প্রেম বিশ্বের সকলের জন্যে আমাদের দুজনের মিলন সেই প্রেমের পথকেই খুলে দেবে । পথের মাঝখানটা ঘিরে নিয়ে দেয়াল তুলবে না । শুনে সোমশংকরের ভালোবাসা দ্বিগুণ প্রবল হয়েছে । সেই ভালোবাসা নির্বিশেষ প্রেম নয় এ কথা লিখে রাখতে পারো । ”
“ আচ্ছা , একটা কথা জিজ্ঞাসা করি , এ অবস্থায় তুমি হলে কী করতে । ”
“ আমি হলে পরম ভক্তিভরে সন্ন্যাসীর কথা সোনার জলে মরক্কো চামড়ার বাঁধা খাতায় লিখে রাখতুম , তার পরে দুর্দম আসক্তির জোর কলমে তার প্রত্যেক অক্ষরের উপর দিতাম কালির আঁচড় কেটে । ওই তাপস চায় প্রকৃতির মতোই মুগ্ধ করতে , নিজের মন্ত্র দিয়ে অন্যের মন্ত্রটা খন্ডন করবার জন্যে । আমার উপর খাটত না এ মন্ত্র , যদি একটু সম্ভব হত তা হলে সন্ন্যাসী নিশ্চয়ই আমাকে ছেড়ে সুষমার দিকে তাকাত না , এ কথা আমি জোর করেই বলতে পারি । ”
“ বেশ কথা , কিন্তু ইতিহাসের গোড়ার দিকে অনেকটা ফাঁক পড়েছে , সেটা ভরিয়ে নিতে হবে । ওদের বিবাহসম্বন্ধ সন্ন্যাসী ঘটালো কী উপায়ে ?”
“ প্রথমত সেনবংশ যে ক্ষত্রিয় , তারা যে কোনো-এক খৃস্টশতাব্দীতে দক্ষিণ থেকে এসেছিল দিগ্বিজয় বাহিনীর সঙ্গে বাংলাদেশে , সেইটে প্রমাণ করে হিন্দি অনুবাদসহ সংস্কৃততে লিখলে এক পুঁথি । কাশীর কোনো কোনো দ্রাবিড়ী পন্ডিতের সমর্থন জুড়ে দিলে তার সঙ্গে । সন্ন্যাসী স্বয়ং সোমশংকরের রাজ্যে গেল — প্রজারা চেহারা দেখেই তেত্রিশ কোটির মধ্যে কোন্-এক দেবতার অংশাবতার বলে নিলে ওকে মাথায় করে । সভাপন্ডিত শুদ্ধ মুগ্ধ হল আলাপে । কুমায়ুনের কোন্ পাহাড়ে এদের দুজনের ঘটালে সাক্ষাৎ । ওরা দোঁহে মিলে ঘোড়ায় চড়ে ফিরল দুর্গমে , শিকারে বেরোল বনে জঙ্গলে । বীরপুরুষের মন ভুলল অনেকখানি প্রকৃতির মোহে , অনেকখানি সন্ন্যাসীর মন্ত্রে , তার পর এই যা দেখছ । ”
“ ইচ্ছা করছে তরুণ তাপস সংঘে আমিও যোগ দিই । ”
“ কেন , সংসারতাপ নিবারণের জন্যে , না পেটের জ্বালা ? ”
“ সন্ন্যাসীর Love's philosophy যা শুনলুম শেলির সঙ্গে তা মেলে না কিন্তু মনের শান্তি পাবার জন্যে নিজের পক্ষে আশু তার প্রয়োজন । ”
“ যেয়ো সংঘে , কেউ আপত্তি করবে না । কিন্তু তার আগে এমন একটা গল্প লিখে যাও যাকে নাম দিতে পারবে মোহমুদ্গর । ”
“ শংকরের মোহমুদ্গর ? ”
“ হাঁ তাই । সত্য কথা লিখতে শেখো । ফুঁ দিয়ে ফুলিয়ে নয় , আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে । ”
বাঁশরির মুখ লাল হয়ে উঠেছে , দৃষ্টিতে জ্বলছে যেন ইস্পাতের ঝল্সানি । পৃথ্বীশ মনে মনে ভাবছে — কী সুন্দর দেখাচ্ছে একে ।
বাঁশরি একসময়ে চৌকি থেকে উঠে বললে , “ বলবার কথা শেষ হল । এখন মফিজকে বলে আসি তোমার জন্যে কিছু খাবার নিয়ে আসুক । ”
পৃথ্বীশ ছুটে এসে ওর হাত চেপে ধরলে , বললে , “ খাবার চাই নে , তুমি যেয়ো না । ”
বাঁশরি হাত ছুটিয়ে নিয়ে হো হো করে হেসে উঠল । বললে , “ আমাকে হঠাৎ তোমার ‘ বেমানান ' গল্পের নায়িকা বানিয়ে তুলো না , তোমার জানা উচিত ছিল আমি ভয়ংকর সত্যি । ”
ঠিক সেই সময়ে ড্রেসিং গাউন পরে ওর ভাই সতীশ ঢুকে পড়ল ঘরে । জিজ্ঞাসা করলে , “ উচ্চ হাসির আওয়াজ শুনলাম যে । ”
“ উনি এতক্ষণ স্টেজের মনুবাবুর নকল করছিলেন । ভারি মজা । ”
“ পৃথ্বীশবাবুর নকল আসে নাকি ?”
“ ওঁর বই পড়লেই তো টের পাওয়া যায় । শোনো , ওর জন্যে মফিজকে কিছু খাবার আনতে বলে দাও তো । ”
পৃথ্বীশ বললে , “ না দরকার নেই , কাজ আছে , দেরি করতে পরব না । ” বলে দ্রুত নমস্কার করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল । বাঁশরি পিছন থেকে চেঁচিয়ে বললে , “ মনে থাকে যেন আজ বিকেলে সিনেমা আছে । তোমারই সেই পদ্মাবতী । ” উত্তর এল , “ সময় হবে না । ”
বাঁশরি মনে মনে বললে , সময় হবেই জানি । অন্যদিনের চেয়ে দু ঘন্টা আগে ।
সতীশ জিজ্ঞাসা করলে , “ আচ্ছা তুমি ওই পৃথ্বীশের মধ্যে কী দেখতে পাও বলো দেখি । ”
“ ওর বিধাতা ওকে যে পরীক্ষার কাগজ দিয়েছিলেন দেখতে পাই তার উত্তর । আর তার মাঝখানটাতে দেখি পরীক্ষকের কাটা দাগ । ”
“ এমন ফেল-করা জিনিস নিয়ে করবে কী ? ”
“ ওকে প্রথম শ্রেণীতে পাস করাব । ”
“ তার পরে স্বহস্তে প্রাইজ দেবে নাকি ?”
“ সর্বনাশ , দিলে জীবের প্রতি নিষ্ঠুরতা করা হবে । ”
কথা ছিল বর-কনের পরস্পর আলাপ জমাবার অবসর দেওয়া চাই , তাই বিয়ের জন্যে অপেক্ষা করতে হবে অন্তত আরো দু মাস । কিন্তু সেদিন বাঁশরির অনিমন্ত্রিত প্রবেশ দেখে কন্যাপক্ষ সকলে ভয় পেয়ে গেল । বুঝল যে দুর্গ আক্রমণ শুরু হল । সন্ন্যাসীর গাঁথা দেয়াল যদি কোনো মেয়ে টলাতে পারে , সে একা বাঁশরি ।
দিন-পনেরোর মধ্যে বিয়ে স্থির হল । বাইরে বাঁশরির উচ্চহাসি উচ্চতর হতে লাগল , কিন্তু ভিতরে যদি কারো দৃষ্টি পৌঁছত দেখতে পেত পিঁজরের মধ্যে সিংহিনী ঘুরছে ল্যাজ আছড়িয়ে । বেলা দশটা হবে , সোমশংকর বসে আছে বারান্দায় , সামনে মেঝের উপর বসেছে জহরী নানা-প্রকার গয়নার বাক্স খুলে , রেশমি ও পশমি কাপড়ের গাঁঠরি নিয়ে সুযোগের অপেক্ষা করছে কাশ্মীরি দোকানদার , এমন সময় কোনো খবর না দিয়েই এসে উপস্থিত বাঁশরি । বললে , “ ঘরে চলো । ” দুজনে গেল বৈঠকখানায় । সোফায় বসল সোমশংকর , বাঁশরি বসল পাশেই ।
বললে , “ ভয় নেই , কান্নাকাটি করতে আসি নি । তা হোক তবু তোমার ভাবনা ভাববার অধিকার আমাকে দিয়েছ , তাই একটা কথা জিজ্ঞাসা করি , জান কি তুমি , যে সুষমা তোমাকে ভালোবাসে না । ”
“ জানি । ”
“ তাতে তোমার কিছুই যায় আসে না । ”
“ কিছুই না । ”
“ তা হলে সংসারযাত্রাটা কীরকম হবে ?”
“ সংসারযাত্রার কথা ভাবছি নে । ”
“ তবে কিসের কথা ভাবছ । ”
“ ভাবছি একমাত্র সুষমার কথা । ”
“ অর্থাৎ তোমাকে ভালো না বেসেও কী করে ও সুখী হবে ? ”
“ সুষমার মতো মেয়ের সুখী হবার জন্যে ভালোবাসার দরকার নেই । ”
“ কিসের দরকার আছে , টাকার ?”
“ এটা তোমার যোগ্য কথা হল না বাঁশরি — এটা যদি বলত কলুটোলার ঘোষগিন্নি আশ্চর্য হতুম না । ”
“ আচ্ছা , ভুল করেছি । কিন্তু প্রশ্নটার উত্তর বাকি আছে । কিসের দরকার আছে সুষমার । ”
“ জীবনে ও একটা কোন্ লক্ষ্য ধরেছে , সেইটে ওর ধর্ম । সাধ্যমতো আমি যদি কিছু পরিমাণে তাকে সার্থক করতে পারি তা হলেই হল । ”
“ লক্ষ্যটা কী বোধহয় জান না । ”
“ জানবার চেষ্টাও করি নি । যদি আপনা হতে ইচ্ছে করে বলে জানতে পাব । ”
“ অর্থাৎ ওর লক্ষ্য তুমি নও , তোমার লক্ষ্য ওই মেয়ে । ”
“ তাই বলতে পারি । ”
“ এ তো পুরুষের মতো শোনাচ্ছে না , ক্ষত্রিয়ের মতো নয়ই । ”
“ আমার পৌরুষ দিয়ে ওর জীবন সম্পূর্ণ করব , ওর ব্রত সার্থক করব — আর কিছু চাই নে আমি । আমার শক্তিকে ওর প্রয়োজন আছে এই জেনে আমি খুশি । সেই কারণে সকলের মধ্যে আমাকেই ও বেছে নিয়েছে এই আমার গৌরব । ”
“ এতবড়ো পুরুষকে মন্ত্র পড়িয়েছে সন্ন্যাসী । বুদ্ধিকে ঘোলা করেছে , দৃষ্টিকে দিয়েছে চাপা । শুনলুম ভালো হল আমার , শ্রদ্ধা গেল ভেঙে ; বন্ধন গেল ছিঁড়ে । শিশুকে মানুষ করার কাজ আমার নয় , সে কাজের ভার সম্পুর্ণ দিলুম এই মেয়েকে । ”
এমন সময় ঘরে প্রবেশ করল মুক্তারাম । পদধূলি নিয়ে তাকে প্রণাম করলে সোমশংকর ।
অগ্নিশিখার মতো বাঁশরি দাঁড়াল তার সামনে । বললে , “ আজ রাগ করবেন না । ধৈর্য ধরবেন , কিছু বলব , কিছু প্রশ্ন করব । ”
“ আচ্ছা বলো তুমি । ” – মুক্তারামের ইঙ্গিতে সোমশংকর চলে গেল ।
“ জিজ্ঞাসা করি , সোমশংকরকে শ্রদ্ধা করেন আপনি । ”
“ বিশেষ শ্রদ্ধা করি । ”
“ তবে কেন এমন মেয়ের ভার দিচ্ছেন ওর কাঁধে যে ওকে ভালোবাসে না । ”
“ যে ভার দিয়েছি আমি তাকেই বলি মহদ্ভাব । বলি পুরস্কার । একমাত্র সোমশংকর সুষমাকে গ্রহণ করবার যোগ্য । ”
“ ওর চিরজীবনের সুখ নষ্ট করতে চান আপনি ? ”
“ সুখকে উপেক্ষা করতে পারে ওই বীর মনের আনন্দে । ”
“ আপনি মানবপ্রকৃতিকে মানেন না ? ”
“ নবপ্রকৃতিকেই মানি , তার চেয়ে নীচের প্রকৃতিকে নয় । ”
“ এতই যদি হল — বিবাহ ওরা নাই করত । ”
“ তের সঙ্গে ব্রতকে প্রাণের বন্ধনে যুক্ত করতে চেয়েছিলুম । খুঁজেছিলুম তেমন দুটি মানুষকে , দৈবাৎ পেয়েছি । এটা একটা সৃষ্টি হল । ”
আর কেউ হলে বাঁশরি জিজ্ঞাসা করত — ‘আপনি নিজেই করলেন না কেন ? ' কিন্তু মুক্তারামের চোখের সামনে এ প্রশ্ন বেধে গেল ।
বললে , “ পুরুষ বলেই বুঝতে পারছেন না , ভালোবাসা নইলে দুজন মানুষকে সম্পুর্ণ করে মেলানো যায় না । ”
“ মেয়ে বলেই বুঝতে চাইছ না যে , প্রেমের মিলন ভালোবাসার চেয়ে সত্য ,তাতে মোহের মিশেল নেই । ”
“ সন্ন্যাসী , তুমি জান না মানুষকে । তার হৃদয়গ্রনিথ জোর করে টেনে ছিঁড়ে সেই জায়গায় তোমার নিজের আইডিয়ার গ্রন্থি জুড়ে দিয়ে অসহ্য ব্যাথার 'পরে বড়ো বড়ো বিশেষণ চাপা দিতে চাও । গ্রন্থি টিকবে না । ব্যাথাই যাবে থেকে । মানুষের লোকালয়ে তোমরা এলে কী করতে — যাও-না তোমাদের গুহার গহ্বরে বদরিকাশ্রমে — সেখানে মনের সাধে নিজেদের শুকিয়ে মারতে চাও মারো , আমরা সামান্য মানুষ আমাদের তৃষ্ণার জল মুখের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে মরুভুমিতে ছড়িয়ে দিয়ে তাকে সাধনা বলে প্রচার করতে এলে কোন্ করুণায় ? আমাদের অভিশাপ লাগবে না তোমাকে ? যা তুমি নিজে ভোগ করতে জান না তা তুমি ভোগ করতে দেবে না ক্ষুধিতকে ?
“ এই যে সুষমা , শোনো বলি , মেয়েরা চিতার আগুনে মরেছে অনেকে , ভেবেছে তাতেই পরমার্থ । তেমনি করে দিনে দিনে মরতে চাও জ্বলে — চাও না তুমি ভালোবাসা । কিন্তু যে চায় , পাষাণ করে নি যে আপন নারীর প্রাণ , কেন কেড়ে নিতে এলে তার চিরজীবনের সুখ । এই আমি আজ বলে দিলুম তোমাকে , ঘোড়ায় চড়ো , শিকার করো যাই কর , তুমি পুরুষ নও , আইডিয়ার সঙ্গে গাঁঠছড়া বেঁধে তোমার দিন কাটবে না গো , তোমার রাত বিছিয়ে দেবে কাঁটার শয়ন । ”
বাঁশরির উত্তেজিত কন্ঠস্বর শুনে বাইরে থেকে তাড়াতাড়ি এল সোমশংকর । বললে , “ বাঁশি , শান্ত হও , চলো এখান থেকে । ”
“ যাব না তো কী । মনে কোরো না বুক ফেটে মরব , জীবন হয়ে থাকবে চির-চিতানলের শ্মশান । কখনো আমার এমন বিচলিত দশা হয় নি — আজ কেন বন্যার মতো এল এই পাগলামি! লজ্জা , লজ্জা , লজ্জা — তোমাদের তিনজনের সামনেই এই অপমান । মুছে ফেলব লজ্জা ,এর চিহ্ন থাকবে না।চললুম। ”
সন্ধেবেলায় কোনো একটা উপলক্ষে সানাই বাজছে সুষমাদের বাড়িতে । বাঁশরি তখন তার একলা বাড়ির কোণের ঘরে বসে পড়ছে একটা খাতা নিয়ে । শেষ হয়ে গেছে পৃথ্বীশের লেখা গল্প । নাম তার , ‘ভালোবাসার নীলাম' ।
নায়িকা পঙ্কজা কেমন করে অর্থলোভে দিনে দিনে সার চন্দ্রশেখরের মন ভুলিয়ে তাকে আয়ত্ত করলে তার খুব একটা টকটকে ছবি , সুনিপুণ তন্নতন্ন তার বিবরণ । দুই নম্বরের নায়িকা দীপিকা নির্বোধকে উদ্ধার করবার চেষ্টা করছে প্রাণপণে , শেষকালে কী অসহ্য ঘৃণা , কী বুকফাটা কান্না । ছুটে বেরোলে আত্মহত্যা করতে , শীতকালে জলে পা দিতে গিয়েই হঠাৎ কাঁপুনি দিয়ে শীত করে উঠল , কিংবা হঠাৎ মনে সংকল্প এল বেঁচে থেকেই শেষ পর্যন্ত ওদের দুজনকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মারবে । দ্বিধার এই দুটো কারণের মধ্যে কোন্টা সত্য সেটা কৌশলে অনিশ্চিত রাখা হয়েছে ।
পৃথ্বীশ কখন এক সময় পা টিপে টিপে একটা চেয়ারে এসে বসেছে পিছন দিকে । বাঁশরি জানতে পারে নি । পড়া হয়ে যেতেই বাঁশরি খাতাখানা যখন ধপ করে ফেললে টেবিলের উপর — পৃথ্বীশ সামনে এসে বললে , “ কেমন লাগল । মেলোড্রামার খাদ মিশোই নি এক তোলাও । সেন্টিমেন্টালিটির তরল রস চায় যারা তাদের পক্ষে নির্জলা একাদশী ; একেবারে নিষ্ঠুর সত্য । ”
বাঁশরি বললে , “ কেমন লাগল ? এই দেখিয়ে দিচ্ছি । ” বলে পাতাগুলো ছিঁড়তে লাগল একটার পর একটা । পৃথ্বীশ বললে , “ করলে কী ? আমার সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ লেখা নষ্ট করলে , তা জান । ”
“ কী দাম চাই ? ”
“ তোমাকে । ”
“ আমাকে ? নিতে সাহস আছে তোমার ?”
“ আছে । ”
“ সেন্টিমেন্ট এক ফোঁটাও থাকবে না । ”
“ নেই রইল । ”
“ নির্জলা একাদশী , নিষ্ঠুর সত্য । ”
“ রাজি আছি । ”
“ আচ্ছা , রাজি ? দেখো , নভেল লেখা নয় , সত্যিকার সংসার । ”
“ শিশু নই আমি , এ কথা বুঝি । ”
“ না মশায় , কিছু বোঝ না । বুঝতে হবে দিনে-দিনে পলে-পলে , বুঝতে হবে হাড়ে-হাড়ে । ”
“ সেই হবে আমার জীবনের সব চেয়ে বড়ো অভিজ্ঞতা । আমাকে ভয় দেখাতে পরবে না কিছুতেই । ”
“ সত্যি কথা বলি । এত দিন তোমাকে কাছে কাছেই দেখলুম , বুদ্ধি তোমার পাকে নি , তাই কেবলই ধার ক'রে ক'রে কাজ চালাও । মেয়েদের সম্বন্ধে বইপড়া কথা অনেক শুনেছি তোমার মুখে । একটা কথা শুনে রাখো , যারা অবুঝ তাদের উপর মেয়েদের খুব একটা টান আছে , যেমন মমতা রোগাদের 'পরে । ওদের ভার পেলে মেয়েদের বেকার দশা ঘোচে । তোমার উপর আমার সত্যিকার স্নেহ জন্মেছে । এতদিন তোমাকে বাঁচিয়ে এসেছি তোমার নিজের নির্বুদ্ধিতা আর বাইরের বিরুদ্ধতা থেকে । সেইজন্যে যে সর্বনেশে প্রস্তাব এইমাত্র করলে সেটাতে সম্মতি দিতে আমার দয়া হচ্ছে । ”
“ সম্মতি যদি না দাও তা হলে যে নির্দয়তা হবে তার তুলনা নেই । ”
“ মেলোড্রামা ? ”
“ না , মেলোড্রামা নয় । ”
“ আজ না হোক কাল মেলোড্রামা হয়ে উঠবে না ? ”
“ যদি কোনোদিন হয়ে ওঠে তবে ওই খাতার মতো দিনগুলোকে নিজের হাতে ছিঁড়ে ছিঁড়ে ফেলে দিয়ো । ”
বাঁশরি উঠে দাঁড়িয়ে বললে , “ আচ্ছা দিলেম সম্মতি । ”
পৃথ্বীশ ওর দিকে লাফ দিয়ে এল । বাঁশরি পিছু হঠে গিয়ে বললে , “ এখনি শুরু হল! এখনো ভালো করে ভেবে দেখো — পিছোবার সময় আছে । ”
পৃথ্বীশ হাত জোড় করে বললে , “ মাপ করো আমাকে । ভয় হচ্ছে পাছে তোমার মত বদলায় । ”
“ বদলাবে না । অমন করে মুখের দিকে তাকিয়ে থেকো না । যাও রেজিস্ট্রারের আপিসে । যত শীঘ্র পার বিয়ে হওয়া চাই । নিমন্ত্রণের চিঠি ছাপতে দিয়ো আজই । ”
“ অনুষ্ঠান কিছু হবে না ? ”
“ কিছু না , একেবারে নির্জলা একাদশী । ”
“ কাউকে নিমন্ত্রণ ? ”
“ কাউকে না । ”
“ কাউকেই না ? ”
“ আচ্ছা , সোমশংকরকে । আর-একটা কথা বলি , গল্পটার কপি নিশ্চয় আছে তোমার ডেস্কে, সেটা পুড়িয়ে ফেলো,
নইলে শান্তি পাবে না আমার হাতে । ”
পরের দিন সোমশংকর এল । বাঁশি বললে , “ তুমি যে । ”
“ নিমন্ত্রণ করতে এসেছি । জানি অন্য পক্ষ থেকে তোমাকে নিমন্ত্রণ করবে না । কিন্তু আমার দিক থেকে কোনো সংকোচ নেই । ”
“ কেন নেই ?”
“ একদিন আমি তোমাকে যা দিয়েছি আর তুমি আমাকে যা দিয়েছ এ বিবাহে তাকে কিছুমাত্র স্পর্শ করবে না তা তুমি জান । ”
“ তবে বিবাহ করতে যাচ্ছ কেন ? ”
“ সে কথা বুঝতে যদি নাও পার , তবু আমার উপর দয়া কোরো । ”
“ নাই-বা বুঝলুম , তুমি বলো । ”
“ সন্ন্যাসীর কাছ থেকে যে ব্রত নিয়েছি বোঝাতে পারব না সে , আমার ভালোবাসার চেয়ে বড়ো । তাকে সম্পন্ন করতেই হবে বাঁচি আর মরি । ”
“ আমাকে সঙ্গে নিয়ে সম্পন্ন হতে পারত না ? ”
“ যদি পারত তবে বাধা ঘটত না । তুমি নিজেকে ভুল বোঝাও না , তাই জানি , তুমি নিশ্চিত জানো তোমার ভালোবাসা টলিয়ে দিল আমাকে কেন্দ্র থেকে । তোমার কাছে আমি দুর্বল । যে দুঃসাধ্য কর্মে সুষমার সঙ্গে সন্ন্যসী আমাকে মিলিয়েছেন , সেখানে আমাদের বিচলিত হবার অবকাশ নেই । সেখানে ভালোবাসার প্রবেশপথ বন্ধ । ”
অশ্রু গোপন করার জন্যে চোখ নিচু করে বাঁশরি বললে , “ এখনো সস্পূর্ণ করে বলো নি , কেন এলে আজ আমার এখানে ? ”
“ আমার ভালোবাসার কিছু চিহ্ন রেখে যাচ্ছি তোমার কাছে , ফিরিয়ে দিতে পারবে না । ”
ডুব সাঁতার দিয়ে জল থেকে তুলে এনেছিল , সেই কন্ঠী , সেই ব্রেসলেট , সেই ব্রোচ । ধরলে বাঁশরির সামনে । বাঁশরি বললে , “ মনে করেছিলাম হারিয়েছে , ফিরে পেয়ে আরো বেশি করে পেলুম । নিজের হাতে পরিয়ে দাও আমাকে । ”
সোমশংকর একে-একে গয়নাগুলি পরিয়ে দিলে যত্ন করে । বাঁশরি বললে , “ শক্ত আমার প্রাণ , তোমার কাছেও কোনো দিন কেঁদেছি বলে মনে পড়ে না । আজকে যদি কাঁদি কিছু মনে কোরো না । ” এই বলে মাথা রাখল সোমশংকরের বুকের উপর ।
বিবাহের আগের দিন সন্ধ্যাবেলা । সুষমাদের যে-ঘরে বিবাহ-সভা বসবে , যেখানে আসন পড়বে বর-কনের , সেখান থেকে সমস্ত লোকজন সরিয়ে দিয়ে , সুষমা একলা বসে মেঝের উপর একটা পদ্মফুলের আলপনা এঁকেছে । থালায় আছে নানা জাতের ফুল ফল , ধূপ জ্বলছে , ইলেকট্রিক আলো নিবিয়ে প্রদীপ জ্বালানো হয়েছে । ঘরের দ্বারের কাছে সুষমা বসে আছে চুপ করে । মুক্তারামকে ডেকে পাঠিয়েছে । এখনি সে আসবে ।
এল মুক্তারাম । সুষমা অনেক্ষণ তার পায়ের উপর মাথা দিয়ে রইল পড়ে । তার পর সেই আলপনা-কাটা জায়গায় আসন পেতে বসালে তাকে । বললে , “ প্রভু দুর্বল আমি , মনের গোপনে যদি পাপ থাকে আজ সমস্ত ধুয়ে দাও । আমার সমস্ত আসক্তি দূর হোক , জয়যুক্ত হোক তোমার বাণী ।আজ সন্ধ্যায় এইখানে তোমার প্রসন্ন দৃষ্টির সামনে তোমার চরণস্পর্শে আমার নতুন জীবন আরম্ভ হোক । কাল থেকে তোমার ব্রতের পথে যাত্রা করে চলব শেষ দিন পর্যন্ত । ”
মুক্তারাম উঠে দাঁড়ালে । কোনো কথা না বলে ডান হাতে স্পর্শ করলে সুষমার মাথা । সুষমা থালা থেকে ফুলগুলি নিয়ে মুক্তারামের দুই পা ঢেকে দিলে ।
পরিশিষ্ট
পৃথ্বীশ একখানা চিঠি পেলে । চলে গেল সব কাজ থেকে ছুটি নিয়ে ডেরাদুনে , একটা নিষ্ঠুর গল্প লেখবার জন্য । সকলের চেয়ে কালিমা লেপনে পূজনীয়ের চরিত্রে । এই তার প্রতিশোধ , তার সান্ত্বনা । পাঠকেরা বুঝলে কাদের লক্ষ্য করে লেখা , উপভোগ করলে কুৎসা , বললে এইটে নবযুগের বাংলা সাহিত্যের একটা শ্রেষ্ঠ অর্ঘ্য । একজন ভক্ত যখন লেখাটা মুক্তারামকে দেখালে , মুক্তারাম বললে — “ লেখকের শক্তি আছে রচনার । ”
সমাপ্ত
0 comments:
Post a Comment