মেসে
যা-ই বলিয়া ডাকুক, আমরা উলঝলুলকে জাহাঙ্গীর বলিয়াই ডাকিব।
জাহাঙ্গীরের
পৈতৃক
বাড়ি
কুমিল্লা
জেলায়। তবে সে কলিকাতায় থাকিয়াই মানুষ হইয়াছে। তাহার পিতা ছিলেন কুমিল্লার একজন বিখ্যাত জমিদার ও মানীলোক।
বৎসর
চারেক
হইল,
তাঁহার
মৃত্যু
হইয়াছে। সে-ই এখন তাঁহার বিপুল জমিদারির উত্তরাধিকারী। তবে তাহার মাতা আজও জীবিতা, এবং জমিদারি পরিচালনা করেন তিনিই।
তাঁহার
জমিদারি
পরিচালনের
অতিদক্ষতা
দর্শনে
লোকে
নাকি
বলাবলি
করে
যে,
মেয়েরা
সুযোগ
পাইলে
জমিদারি
তো
চালাইতেই
পারে,
কাছা
আঁটিয়া
ঘোড়ায়ও
চড়িতে
পারে!
তাঁহার
শাসনে
বাঘে-গোরুতে এক ঘাটে জল না খাক, তাঁহার জমিদারির বড়ো বড়ো রুই-কাতলা ও চুনোপুঁটি এক জালে বদ্ধ হইয়া একসাথে নাকানি-চুবানি হইয়াছে। হিন্দু প্রজারা তাঁহাকে বলিত ‘রায়বাঘিনী’ এবং মুসলমানেরা বলিত ‘খাঁড়ে দজ্জাল’ (খরে দজ্জাল)!
জাহাঙ্গীরের
পিতা
বাঁচিয়া
থাকিতে
তাহার
পিতা-মাতা বৎসরের অধিকাংশ সময় কলিকাতাতেই কাটাইয়াছেন। তাহাদের দু-চারখানা বাড়িও ছিল কলিকাতায়।
কিন্তু
তাহার
পিতার
মৃত্যুর
পর
জাহাঙ্গীরের
মাতা
সে
সমস্ত
ভাড়া
দিয়া
ছেলেকে
বেকার
হোস্টেলে
রাখিয়া
নিজে
জমিদারি
দেখিতে
কুমিল্লা
চলিয়া
যান।
জাহাঙ্গীরের
ধাতে
কিন্তু
হোস্টেলের
জেল
কয়েদির
জীবন
সহিল
না। সে হোস্টেল ছাড়িয়া মেসে আসিয়া আস্তানা গাড়িল।
ইচ্ছা
করিলে
সে
হয়তো
আলাদা
বাসা
বাঁধিয়াই
থাকিতে
পারিত,
কিন্তু
কেন
যে
তাহা
করিল
না,
তাহা
তাহার
বিধাতাপুরুষই
জানেন। সে মাসে সহস্র মুদ্রা ব্যয় করিলেও হয়তো তাহার মাতা বিশেষ আপত্তি করিতেন না, তাঁহার অপত্য স্নেহ এতই প্রবল ছিল; কিন্তু জাহাঙ্গীর কোনো মাসে এক শত টাকার বেশি খরচ করিয়াছে, এ বদনাম স্টেটের অতি কৃপণ দেওয়ানজিও দিতে পারেন নাই। ইহাতে জাহাঙ্গীরের মাতা খুশিই হইয়াছিলেন, কিন্তু তাহার খাওয়া-পরার অতিমাত্রায় সাধাসিধে ধরন তাঁহাকে পীড়া দিত।
অত
বড়ো
স্টেটের
ভাবী
মালিক,
সে
যদি
সংসারে
এমনই
বীতশ্রদ্ধ
হইয়া
থাকে
এবং
এমন
মুসাফিরি
হালে
চলাফেরা
করে,
তবে
কাহার
জন্য
এ
পণ্ডশ্রম?
কিন্তু
ইহা
লইয়া
পুত্রকে
অনুরোধ
বা
অনুযোগ
করা
বৃথা। তাঁহার উপরোধে বা আদেশে জাহাঙ্গীর বরং ঢেঁকি গিলিবার চেষ্টা করিবে, তবু তাহার চলাফেরার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করিতে দিবে না।
বহুদিন
হইতেই
জাহাঙ্গীরের
চোখে
মুখে,
চলাফেরায়,
কঠিন
জীবনযাপনের
মধ্যে
মাতা
এই
বিরস
ঔদাসীন্য,
বেদনাসিক্ত
অশ্রদ্ধা
দেখিয়া
আসিতেছেন
এবং
তিনি
তাহার
কারণও
জানিতেন,
তাই
মা
হইয়াও
তিনি
পুত্রকে
দস্তুর
মতো
ভয়
করিয়া
চলিতেন। তিনি যেন পুত্রের কেউ নন। মাতা-পুত্রের মধ্যে এই দুর্লঙ্ঘ্য ব্যবধানের সৃষ্টি ইতিপূর্বে হইয়া গিয়াছিল, কিন্তু জাহাঙ্গীর এখন আর বাহিরের দিক দিয়া সহজে তাহা ধরা পড়িবার অবকাশ দেয় না।
সে
বলে,
‘কী
করব
মা,
আমার
স্বভাবই
এই,
কিচ্ছু
ভালো
লাগে
না
যেন।’ সে বলে বটে হাসিয়াই, কিন্তু তাহার পীড়িত মনের চাপ মুখের মুকুরে ধরা পড়ে।
জননী
অশ্রু
সংবরণ
করিয়া
উঠিয়া
যান। তাঁহার এ দুর্বলতার একটু ইতিহাস আছে। তাহাই বলিতেছি।–
জাহাঙ্গীর
যখন
‘জননী
ও
জন্মভূমিকে
স্বর্গাদপি
গরীয়সী’
বলিয়া
সবে
মাত্র
শ্রদ্ধা
নিবেদন
করিতে
শিখিয়াছে,
সেই
সময়
অকস্মাৎ
অপ্রত্যাশিতভাবে
সে
শুনিল,
তাহার
মাতা
কলিকাতারই
এক
জন
ডাকসাইটে
বাইজি
এবং
তাহার
পিতা
চিরকুমার!
সে
তাহার
পিতামাতার
কামজ
সন্তান!
সেই
দিন
হইতে
তাহার
চোখে
সুন্দর
পৃথিবীর
রং
বদলাইয়া
গিয়াছে। তাহার জীবনের আনন্দ-দীপালিকে যেন থাবা মারিয়া নিভাইয়া দিয়াছে। সে মানুষের জীবনের অর্থ নূতন করিয়া বুঝিবার সাধনা করিতেছে!
সে
তাহার
আদর্শবাদের
কাচ
দিয়া
বাসি
পৃথিবীকে
সাত-রঙা করিয়া দেখিয়াছে, সহজ মানুষকে আপন-মনের মাধুরী দিয়া বিচিত্রতর করিয়া সৃষ্টি করিয়াছে; কিন্তু আজ সে উদ্যতদণ্ড বিচারকের মতো নির্মম, সে এই পৃথিবীর বিচার করিবে! সে আজ সৃষ্টিকে তাহার এই বারবিলাসিনির মতো ব্যবসাদারী সাজসজ্জার ভণ্ডামির জন্য শাস্তি দিবে!
নিষ্ঠুর
বজ্রালোকে
আজ
সত্যের
সহিত
তাহার
মুখোমুখি
পরিচয়
হইয়া
গিয়াছে। আজ সে কঠোর বাস্তবব্রতী!…

0 comments:
Post a Comment