Breaking News
Loading...

Info Post

[]সালার

২৯শে জানুয়ারি
(
প্রভাত,– চায়ের টেবিল সম্মুখে)নূরু!

তোর চিঠিটা আমার ভোজপুরি দারোয়ান মশায়ের ‘থ্রু’ দিয়ে কাল সান্ধ্য-চায়ের টেবিলে ক্লান্ত করুণ বেশে এসে হাজির দেখিরিডাইরেকটের ধস্তাধস্তিতে বেচারার অঙ্গ ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে আমি ক্ষিপ্রহস্তে সেই চক্রলাঞ্ছিতওষ্ঠাগতপ্রাণপ্রভুভক্ত লিপিবরের বক্ষ চিরে তার লিপিলীলার অবসান করে দিলাম – বেজায় উষ্ণমস্তিষ্ক চায়ের কাপ তখন আমার পানে রোষকষায়িত লোচনে চেয়ে চেয়ে ধূম্র উদ্গিরণ করতে লাগল খুব ধৈর্যের সঙ্গে তোর লিপিচাতুর্য – যাকে আমরা মোটা কথায় বাগাড়ম্বর বলি দেখে খানিকটা ঠাণ্ডা দুধ ঢেলে আগে চায়ের ক্রোধ নিবারণ করলাম তারপর দু-চামচ চিনির আমেজ দিতেই এমন বদরাগী চায়ের কাপটি দিব্যি দুধে-আলতায় রঙিন হয়ে শ্রান্ত-মধুর-




রূপে আমার চুম্বনপ্রয়াসী হয়ে উঠল তুই শুনে ভয়ানক আশ্চর্য হবি যেতোর ‘কোঁদলে’ ‘চামুণ্ডা’ ‘রণরঙ্গিণী’ ভাবিসাহেবা ‘তত্রস্থানে’ সশরীরে বর্তমান থাকা সত্ত্বেও (অবিশ্যিতখন গুম্ফশ্মশ্রুবহুল বিশাল লাঠিস্কন্ধে ভোজপুরি মশাই ছিলেন না সেখানেএবং তাঁর মৌরসিস্বত্ব বেমালুম বেদখল হচ্ছে দেখেও তিনি কোনো আপিল পেশ করেননি
আহা হাতাঁর মতো স্বামীসুখাভিলাষিণী, ‘উদ্ভট ত্যাগিনী’  ঘোর কলিকালে মরজগতে নিতান্তই দুর্লভ রেনিতান্তই দুর্লভ আশা করি মৎকর্তৃক তোর শ্রদ্ধেয়া ভাবিসাহেবার এই গুণকীর্তন (কোঁদলে রণরঙ্গিণী আর চামুণ্ডা এই কথা কটি বাদ দিয়ে কিন্তু!) তোর পত্র মারফতে তাঁর গোচরীভূত হতে বাকি থাকবে না

আমাদের খুকির বেশ দু-একটি করে কথা ফুটছে – এই দ্যাখসে এসে তোর চিঠিটার হাঁ-করে থাকা ক্লান্ত খামের মুখে চামচা চামচা চা ঢেলে তার তৃষ্ণা নিবারণ করচেআর বলচে ‘চা – পিয়াচ!’ – সে তোর ওই রণসাজ-পরা খেজুর গাছের মতো ফটোটা দেখে চা-চা করে ছুটে যায়আবার দু-এক সময় ভয়ে পিছিয়ে আসে এই খুদে মেয়েটা সংসারের সঙ্গে আমায় পিঠমোড়া করে বেঁধে ফেলেছে শুধু কি তাই ‘আফলাতুন’ মেয়ের জুলুমে মায়েরও পরমার্থ-চিন্তা অনেক কমাতে হয়েছে আর সোফিয়ার তো সে জান্মাকে সেদিন এই নিয়ে ঠাট্টা করাতেমা বললেন, ‘বাবামূলের চেয়ে সুদ পিয়ারাএখন ঠাট্টা করছিসপরে বুঝবি যখন তোর নাতি-পুতি হবে’ – মা- নমাজ পড়ার তো সে ঘোর বিরোধী মা যখন নমাজ পড়বার সময় ‘সেজদা’ যানসে তখন হয় মায়ের ঘাড়ে চড়ে বসে থাকেনতুবা তাঁর ‘সেজদা জায়গায় বসে ‘দা-দা’ করে এমন করুণভাবে কাঁদতে থাকে যেমায়ের আর তখনকার মতো নমাজই হয় নাআবার মায়ের দেখাদেখি সেও খুব গম্ভীরভাবে নমাজ পড়ার মতো মায়ের সঙ্গে ওঠে আর বসেতা দেখে আমার তো আর হাসি থামে নাএই এক রত্তি মেয়েটা যেন একটা পাকা মুরুব্বিঝি-দের অনুকরণে সে আবার হাত-মুখ খিঁচিয়ে মায়ের সাথে ‘কেজিয়া’ করতে শিখেছে দুষ্টু ঝিগুলোই বোধ হয় শিখিয়ে দিয়েছে, – খুকি কেজিয়ার সময় মাকে হাত নেড়ে নেড়ে বলে, ‘দুঃছতিন! – ছালা – ছতিন!’

তোকে অনেক কথাই জানাতে হবে কাজেই চিঠিটা হয় তোরই মতো ‘বক্তিমে ভরা বলে বোধ হবে অতএব একটু মাথা ঠান্ডা করে পড়িস আমরা হচ্ছি সংসারী লোকসবসময় সময় পাই না আবার সময় পেলেও চিঠি লেখার মতো একটা শক্ত কাজে হাত দিতে ইচ্ছে হয় না তাতে আমার ধাত তো তোর জানা আছে, – যখন লিখি তখন খুবই লিখিআবার যখন লিখি নে তখন একেবারে গুম তুই আমার অভিমানের কথা লিখেছিসকিন্তু ওই মেয়েলি জিনিসটার সঙ্গে আমার বিলকুল পরিচয় নেই আর তারহীন বার্তাবহের সন্দেশ বলে বেশি লাফালাফি করতে হবে না তোকে সন্দেশওয়ালার নাম আমি চোখ বুঁজেই বলে দিতে পারি তিনি হচ্ছেনআমার সহধর্মিণী-সহোদর শ্রীমান মনুয়রদেখেছিস আমার দরবেশি কেরামতিতুই হচ্ছিস একটি নিরেট আহাম্মকতা না হলে ওর কথায় বিশ্বাস করিসহাঁতবে একদিন কথায় কথায় তোকে কাঠখোট্টা বলে ফেলেছিলাম বটেকিন্তু তোর এখনকার লেখার তোড় দেখে আমার বাস্তবিকই অনুশোচনা হচ্চে যেতোকে ওরকম বলা ভয়ানক অন্যায় হয়ে গেছে এখন আমার ইচ্ছে হচ্চেতোর ঘাড়ে কিছু ভয়ানক রকমের উপাধিব্যাধি চড়িয়ে দিকিন্তু নানান ঝঞ্ঝাটে আমার বুদ্ধিটা আজ মগজে এমন সাংঘাতিক রকমে দৌড়ে বেড়াচ্ছে যেতার লাগামটি কষে ধরবারও জো-টি নেই!…

এই হয়েছে রে, –  – য়ে – ছে! – ইতিমধ্যে পাশের ঘরে মুড়ো ঝ্যাঁটাহস্তে দুটো ঝি-এর মধ্যে কোঁদল ‘ফুল ফোর্সে’ আরম্ভ হয়ে গেছে – বুঝেছিসএই মেয়েদের মতো খারাব জানোয়ার আর দুনিয়ায় নেই এরা হচ্ছে পাতিহাঁসের জাত যেখানেই দু-চারটে জুটবেসেখানেই ‘কচর কচর বকর বকর’ লাগিয়ে দেবে এদের জ্বালায় ভাবুকের ভাবুকতাকবির কল্পনা এমন করুণভাবে কর্পূরের মতো উবে যায় যেবেচারিকে বাধ্য হয়ে তখন শান্তশিষ্ট ল্যাজবিশিষ্ট একটি বিশেষ লম্বকর্ণ ভারবাহীর মতোই নিশ্চেষ্ট ভ্যাবাকান্ত হয়ে পড়তে হয় গেরো –গেরোদুত্তোর মেয়েমানুয়ের কপালে আগুনএরা  ঘর হতে আমায় উঠাবে তবে ছাড়বে দেখছি অতএব আপাতত চিঠি লেখা মুলতবি রাখতে হল ভাই আমার ইচ্ছে হয়এই মেয়েগুলোকে গোরু-খেদা করে খেদিয়ে তেপান্তরের মাঠে ঠেলে উঠাই গিয়ে ওঃসব গুলিয়ে দিলে আমার!

(দুপুরবেলা)

বাপ রে বারবাঁচা গেছে! – ঝি দুটোর মুখে ফেনা উঠে এইমাত্র তারা ঘুমিয়ে পড়েছে অতএব কিছুক্ষণের জন্য মাত্র সে ঝগড়াটা ধামাচাপা আছে এই অবসরে আমিও চিঠিটা শেষ করে ফেলি নইলেফের জেগে উঠে ওরা যদি ধামাচাপা ঝগড়াটার জের চালায় তা হলেই গেছি আর কী!অনেক সময় হয়তো আমার কাজে কথায় একটু মুরুব্বি ধরনের চাল অলক্ষিতেই এসে পড়ে আর তোর মতো চিরশিশু মনের তাতেই ঠেকে হোঁচট খেযে ভ্যাবা-চ্যাকা লেগে যায়নয়কিন্তু আমার এদিন ছিল নাআমার মনে তোরই মতো একটি চিরশিশু জাগ্রত ছিল রেসে আজ বাঁধা পড়ে তার সে সরল চঞ্চলতা আর আকুলতা ভুলে গিয়েছে তাই বড়ো দুঃখে আমার সেই মনের বনের হরিণশিশু জলভরা চোখে আকাশের মুক্ত নীলিমায় চেয়ে দেখেআর তার এই সোনার শিকলটায় করুণভাবে ঝংকার দেয়… যাক ওসব কথা তোকে একটা নীরস তত্ত্বকথা শুনাতে চাই এখানেসেইটাই মন দিয়ে শোন –মানুষ যতদিন বিয়ে না করেততদিন তার থাকে দুটো পা সে তখন স্বচ্ছন্দে যে কোনো দ্বিপদ প্রাণীর মতো হেঁটে বেড়াতে পারেমুক্ত আকাশের মুক্ত পাখির মতো স্বাধীনভাবে উড়ে বেড়াতেও পারে; – কিন্তু যেই সে বিয়ে করলেঅমনি হয়ে গেল তার দু-জোড়া বা এক গণ্ডা পা কাজেই সে তখন হয়ে গেল একটি চতুষ্পদ জন্তু বেচারার তখন স্বাধীনভাবে বিচরণ করবার ক্ষমতা তো গেলই (কারণ চার-চারটে পা নিয়ে তো কোনো জন্তুকে উড়তে দেখলাম না!) অধিকন্তু সে হয়ে পড়ল একটা স্থাবর জমি-জমারই মতো একেবারে মাটির সঙ্গে ‘জয়েন’! তারপর দৈবক্রমে যদি একটি সন্তান এসে জুটলতাহলে হল সে একটি ষটপদ মক্ষিকা – সর্বদাই আহরণে ব্যস্ত আর একটি বংশবৃদ্ধি হইলেই – অষ্টপদ পিপীলিকাদিন নেইরাত নেই – ছোটো শুধু আহারের চেষ্টায় তারপরএই বংশবৃদ্ধি যখন বংশ-ঝাড়েরই মতো চরম উন্নতি লাভ করলঅর্থাৎ কিনা নিতান্ত অর্বাচীনের মতো গিন্নি যখন এক বস্তা সন্তান প্রসব করে ফেললেনবেচারা পুরুষ তখন হয়ে গেল একেবারে বহুপদবিশিষ্ট একটি অলস কেন্নোবেশ একটা হতাশ – নির্বিকার ভাবকোনো বস্তু নেই – ছুঁইলেই জড়সড়

আমার এত দূর উন্নতি না হলেও যখন আল্লার নাম নিয়ে শুরু হয়েছে রে ভাইতখন কি আর একে আগড় দিয়েও ঠেকানো যাবে রকম অবস্থায় পড়লে সে সত্যি সত্যিই ‘সবারই মত বদলায়!’…তারপরওরে ছ্যাঁচা ঝিনুকতুই যে অত করে নিজকে লুকিয়ে রাখতে চাস সমুদ্দুরনা ডোবার ভিতরেকিন্তু পারবি কিআমি যে এঁটেল ‘লটে-ছ্যাঁচড়’ ডুবুরিতুই পারস্যোপকূলের সমুদ্রের পাঁকে গিয়ে লুকোলেও  ডুবুরির হাত এড়াতে পারিবি নেজেনে রাখিস মানিক কি কখনও লুকানো যায় রে আহাম্মকখোশবুকে কি রুমাল চাপা রাখা যায়?… হায় কপালএই কুড়ি-একুশ বছর বয়সে তোর মতো উদাসীনরা আবার সংসারের কী বুঝবেশুধু কবির কল্পনায় তোরা সংসারকে ভালোবাসিসএখানের যা কিছু ভালোযা কিছু সুন্দর কেবল তাই তোদের স্বচ্ছ প্রাণে প্রতিফলিত হয়তাই তোদের সঙ্গে আমাদের দুনিয়াদার লোকের কিছুতেই পুরোমাত্রায় খাপ খায় না এক জায়গাতে একটু ফাঁক থাকবেই থাকবেতা আমরা যতই মিশ খাওয়াতে চেষ্টা করি নাকারণবড়ো কঠিনভাবে দুনিয়ার – বাস্তব জগতের নিষ্ঠুর সত্যগুলো আমাদের হাড়ে হাড়ে ভোগ করতে হয়তোরা কল্পনারাজ্যের দেবশিশুবনের চখা-হরিণআর আমরাবাস্তব জগতের রক্ত-মাংসে-গড়া মানবখাঁচার পাখি! – এইখানেই যে ভাই মস্ত আর আদত বৈষম্য!

কোনো ফরাসি লেখক বলেছেন যেখোদা মানুষকে বাক্শক্তি দিয়েছেন শুধু মনকে গোপন করবার জন্যে আর  একেবারে নিরেট সত্য কথা তাই আমার কেন মনে হচ্ছে যেতুই বাইরে এত সরলএত উদারএমন শিশু হয়েও যেন কোন্ এক বিপুল ঝঞ্ঝাকী একটা প্রগাঢ় বেদনার প্রচ্ছন্ন বেগ অন্তরে নিয়তই চেপে রাখছিস! – মানুষকে বোঝা যে বড্ড শক্ত ব্যাপারতা জানিকিন্তু মানুষ হয়ে মানুষের চোখে ধুলো দেওয়াও নেহাত সহজ নয় তোদের মতো লোককে চিনতে পারেন এক তিনিইযিনি নিজের বুকে বেদনা পেয়েছেনআর সেই বেদনা দিয়ে যদি তিনি তোর বেদনা বুঝতে পারেন তবেইতা না হলে যতো বড়োই মনস্তত্ত্ববিদ হনএরকম শক্ত জায়গায় তাঁরা ভয়ানকভাবে ঠকবেনএকটি প্রস্ফুটিত ফুলের হাসিতে যে কত কান্নাই লুকানো থাকেতা কে বুঝবেফুলের ওই শুভ্র বুকে যে ব্যথার কীটে কত দাগ কেটেছেকে তা জানতে চায়? – আমরা উপভোগ করতে চাই ফুলের ওই হাসিটিওই উপরের সুরভিটুকু!

সত্য বলতে গেলেআমি যতই বড়াই করি ভাইকিন্তু তোকে বুঝে উঠতে পারলাম না যখনই মনে করেছিএই তোর মনের নাগাল পেয়েছিঅমনি তোর গতি এমন উলটো দিকে ফিরে যায় যেআমি নিজের বোকামিতে নিজেই না হেসে থাকতে পারিনে এই তোর যুদ্ধে যাবার আগের ঘটনাটাই ভেবে দেখ না! – আমার যেন একদিন মনে হল যেসোফিয়ার সই মাহ্বুবাকে দেখে তুই মুগ্ধ হয়েছিস তাই বড়ো আনন্দে সেদিন গেয়েছিলাম, ‘এবার সখী সোনার মৃগ দেয় বুঝি ধরা!’ এবং আমার মোটা বুদ্ধিতে সব বুঝেছি মনে করে তার সঙ্গে তোর বিয়ের সব ঠিক-ঠাক করলামএমন সময় হঠাৎ একদিন তুই যুদ্ধে চলে গেলি আমার ভুল ভাঙলঅনেকের বুক ভাঙলসোনার শিকল দেখে পাখি মুগ্ধ হয়ে যেন কাছিয়ে এসেছিলকিন্তু যেই জানলে ওতে বাঁধনের ভয় আছেঅমনি সে সীমাহীন আকাশে উড়ে গেল

এইখানে আর একটা কথা বলিকিন্তু তুই মনে করিস না যেন যে আমি নিজের সাফাই গাইছি প্রথমে সত্য সত্যই তোর  বিয়েতে আমার উৎসাহ ছিল নাযদিও কেউ ক্ষুণ্ণ হবে বলে আমি  কথাটা কাউকে তেমন জানাইনি তার প্রধান কারণতুই কোথাও কোনো ধরা-ছোঁওয়া দিসনি আবার যেখানে ইচ্ছা করে ধরা দিতে গিয়েছিসসেইখানেই কার নিষ্ঠুর হাত এসে তোকে আলাদা করে দিয়েছেমুক্ত করে দিয়েছেসে-কোন্ চপল যেন তোর খেলার সাথিসে-কোন্ চঞ্চলের যেন তুই ছাড়া-হরিণতাই কোনো বাঁধন তোকে বাঁধতে পারে না কিন্তু  সব জেনেও এমন কিছু ঘটলযাতে আমারও মনটা কেমন গোলমাল হয়ে গেলআমার মস্ত বিশ্বাস ছিল যেপুরুষদের চেয়ে মেয়েরাই মানুষের মন বুঝতে বেশি ওস্তাদকিন্তু এখন দেখছিসব ভুয়ো কারণ তোর মাননীয়া ভাবিসাহেবাই আমায় কান-ভাঙানি দিয়েছিলেন এবং সাফ বুঝিয়ে দিয়েছিলেনতুই নাকি মাহ্বুবাকে দেখে একেবারে মুগ্ধ হয়ে পড়েছিলিএমনকি তুই নাকি আর তোর মধ্যে ছিলি নে এবং মাহ্বুবাও নাকি তোর পায়ে একেবারে মনঃপ্রাণ ‘ডারি’ দিয়েছিল 

এমন দু-তরফা ভালোবাসাকে মাঝ-মাঠে শুকোতে দেওয়া আমাদের মতো নব্যশিক্ষিতদের পক্ষে একরকম পাপ কিনাতাই বড়ো খুশি হয়েই তোদের  বুকের ভালোবাসাকে সোনার সুতোয় গেঁথে দিতে চেয়েছিলাম কিন্তু কাজের বেলায় হয়ে গেল যখন সব উলটোতখন যত দোষ এই নন্দ ঘোষের ঘাড়েই হুড়মুড় করে পড়লঅবশ্য আমার একটু সব দিক ভেবে কাজ করা উচিত ছিলকিন্তু যুবতিদের – আবার তিনি যদি ভার্যা হনতবে তো কথাই নেই – এমন একটা মোহিনী শক্তি আছেযাহা মহা জাহাঁবাজ পুরুষেরও মন একেবারে গলে মোম হয়ে যায়তখনকার মতো বেচারার আর আপত্তি করবার মতো কোনো শক্তিই থাকে না সাধে কী আর জ্ঞানীরা বলেছেন যেমেয়েরা আগুনআর পুরুষ সব মোম, – কাছাকাছি হয়েছে কী গলেছে আমি আমার ধৈর্যশীলতার জন্যে চির-প্রসিদ্ধ কি-নাতাই এখন যত মিথ্যা অপরাধের বোঝাগুলোও নির্বিকার চিত্তে বইতে হচ্ছে এক কথায়, – ওই যে কী বলে, – আমি হচ্ছি ‘সাহেবের দাগা পাঁঠা!’

তারপরআমি এখন ভাবচি যেযে-যুদ্ধের মানুষ কাটাকাটির বিরুদ্ধেবক্তিমের’ তোড়ে তুই সুরেনবাবুর রুটি মারবার জোগাড় করেছিলিমাঝে আবার জীবহত্যা মহাপাপ বলে স্রেফ শাকান্নভোজী নিরামিষ-প্রাণী বা পরমহংস হয়ে পড়েছিলিসেই তুই জানি নে কোন্ অনুপ্রেরণায় এই ভীম নরহত্যার যজ্ঞে ঝাঁপিয়ে পড়লিজানি নেসে কোন্ বজ্রবাঁশি তোকে উদ্বুদ্ধ করে তুলেছিলতোর এই বাঁধন হারা প্রাণটিকে জননী জন্মভূমির পায়ে ফুলের মতো উৎসর্গ করে দিতেতবে কি এটা তোর সেই বিপরীত স্বভাবটাযেটা অন্যায়ের খোঁচা না খেলে জেগে উঠত নাঅন্যায়কে রুখতে গিয়ে এক একদিন তুই যেরকম খুনোখুনি ব্যাপার বাধিয়ে তুলতিসতা তো আর কারুর অবিদিত নেইআমি এখনও ভাবিসে সময় কীরকম প্রদীপ্ত হয়ে উঠত একটা অমানুষিক শক্তিতে তোর ওই অসুরের মতো শক্ত শরীরটা আসানসোলে ম্যাচ খেলতে গিয়ে যেদিন একা এক প্রচণ্ড বংশদণ্ড দিয়ে প্রায় এক শত ইংরেজকে খেদিয়ে নিয়ে গিয়েছিলিসেই দিন বুঝেছিলাম তোর ওই কোমল প্রাণের আড়ালে কত বড়ো একটা আগ্নেয় পর্বত লুকিয়ে আছেযেটা নিতান্ত উত্তেজিত না হলে অগ্ন্যুদ্গিরণ করে না
বড়ো কৌতূহল হয়আর জানাও দরকারতাই তোর সমস্ত কথা জানতে চেয়েছিলাম তাতে যদি তোর কোনো পবিত্র স্মৃতির অবমাননা হয় মনে করিসতবে আমি তা জানতে চাই নে আমি সেরকম নরাধম নই কিন্তু  কোন্ ভাগ্যবতী রে যে তোর এমন হাওয়ার প্রাণেও রেখা কেটে দিয়েছেসে কোন্ সুন্দরীর বীণের বেদন তোর মতো চপল হরিণকে মুগ্ধ করেছেকেন তুই তবে এসব কথা কাউকে জানাসনিতুই সত্য সত্যই একটা মস্ত প্রহেলিকা!

সোফিয়ার বিয়ে নিয়ে তোকে আর মাথা ঘামাতে হবে না তুই নিজের চরকায় তেল দে তোর মতো বিবাহ-বিদ্বেষী লোকের আবার পরের বিয়ের এত ভাবনা কেনআমরা মনে করেছিআর তোর ভাবিরও নিতান্ত ইচ্ছা যেমনুয়ের সঙ্গে ওর বিয়ে দিই তোর কী মততবে আরও দু-চার মাস দেরি করতে হবে কেননা মনুর বিপরীক্ষা দেবার সময় খুব নিকট ওর পরীক্ষার ফল বেরিয়ে গেলেই শুভকার্যটা শেষ করে ফেলব মনে করচি তুই সেই সময় ছুটি নিয়ে বাড়ি আসতে পারবি নাকিতুই না এলে যে ঘরের সবকিছু কাঁদবে!

তোর সামনে সোফিয়া তোর খুব বদনাম করত আর তোর সঙ্গে কথায় কথায় ঝগড়া করত বটেকিন্তু তুই যাবার পর হতেই তার মত আশ্চর্য রকমে বদলে গিয়েছে সে এখন তোর এত বেশি প্রশংসা করতে আরম্ভ করেছে যেআমি হিংসে না করে থাকতে পারচি নে তোর এই যুদ্ধে যাওয়াটাকে সে একটা মস্ত কাজের মতো কাজ বলে ডঙ্কা পিটুচ্চে তুই চলে যাবার পর ওর যদি কান্না দেখতিসসাত দিন সাত রাত না খেয়ে না দেয়ে সে শুধু কেঁদেছিল এখনও তোর কথা উঠলেই তার চোক ছলছল করে ওঠে… সে তার হাতের বোনা কয়েকটা ‘কম্ফর্টার’ আর ফুল তোলা রুমাল পাঠিয়েছে তোকেবোধ হয় পেয়েছিস তোকে তোদের এই যুদ্ধের পোশাকে দেখবার জন্যে সে বড্ড সাধ করেছে এখনকার ফটো থাকে তো পাঠাস যখন যা টাকাকড়ির দরকার হবে জানাস এখন আর কোনো কষ্ট হয় না তোএখানে সব একরকম ভালো

উপসংহারে বক্তব্য এই যেতুই আমায় নবনীতকোমল মাংসপিণ্ড-সমষ্টি বলে ঠাট্টা করেছিসকিন্তু এখন এলে দেখতে পাবিএই দু-বছরেই সংসার আর বিবি-সাহেবার চাপে আমি সজনে কাঠের চেয়েও নীরস হয়ে পড়েছি  তোর উপরটা লোহার মতো শক্ত হলেও ভিতরটা ফুলের চেয়েই নরমতুই বাস্তবিকও শুক্তিউপরটা ঝিনুকের শক্ত খোসায় ঢাকা আর ভিতরে মানিক আর আমি হচ্চি ওই – সজনে কাঠের শুকনো ঠ্যাঙা, – না উপরটা মোলায়েমনা ভিতরে আছে কিছু রস-কষ একেবারে 
ভুয়ো – ভুয়ো

ইতি
শুভাকাঙ্ক্ষী
হাড়গোড়-ভাঙা ‘রবিয়ল

বাবা নূরু!

আমার স্নেহ-আশিস জানবে মাকে এরই মধ্যে ভুলে গেলে নিমকহারাম ছেলেআমাকে ভুলেও একটা চিঠি দেওয়া হল না এতদিনের মধ্যেআমি প্রথমে রেগে চিঠিই দিইনি যে ছেলে মায়ের নয়তার ওপর দাবি-দাওয়া কীসেরওরেতোরা কী করে মায়ের মন বুঝবিতা যদি বুঝতিস তবে আর এমন করে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করতিস নে আমায় নাই বা হলাম তোর গর্ভধারিণী জননী আমিতবু যে আমি কোনোদিন তোকে অন্যের বলে স্বপ্নেও ভাবতে পারিনিএকটা কথা আছে, ‘পেটে ধরার চেয়ে চোখে-ধরা বেশি লাগে’ তোরা একথা বুঝতে পারবিনে

আমি চিঠি লিখতাম না বাবাতবে রবু সেদিন হাসতে হাসতে বললে, ‘মা-জানতুমিই ভালো করে নূরুর কথাবার্তায়গল্পে যোগ দিতে না বলে সে রেগে চলে গিয়েছে’ দেখেছিস কথার ছিরি? ‘ছিঁচে পানি’ আর মিছে কথা মানুষের গায়ে বড়ো লাগে তাই কথাটা মিথ্যে হলেও আমার জানে এত লাগল – যেমন মায়ের দোষে ছেলে চলে যাবার পর সেই ব্যথাটা মায়ের প্রাণে গিয়ে বাজেজানিতুই কক্ষণো সে রকম ভাবতে পারিসনেতবু এইখানে কয়েকটা কথা জানিয়ে রাখি বাপকেননা, ‘হায়াত-মওতে কোনো ঠিক-ঠিকানা নেইআমার দিন তো এবার ঘনিয়েই আসচে একদিন এমন ঘুমিয়ে পড়ব যেতোরা ঘরগুষ্টি মিলে কেঁদেও আর জাগাতে পারবি নে আহাখোদা তাই যেন করেনতোদের কোনো অমঙ্গল যেন আমায় আর দেখে যেতে না হয় শোকে-শোকে  বুক ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছে তাই এখন খোদার কাছে চাইছিযেন তোর হাতের মাটি পেয়ে মরতে পারি আমার জান তোর ওখানেই পড়ে আছেকখন ছেলের কী হয়!

দু-এক সময়ে তোর ছেলেমি আর খ্যাপামি দেখে খুবই বিরক্ত হতামকিন্তু ওই বিরক্তির মধ্যে যে কত স্নেহ-ভালোবাসা লুকানো থাকততোরা ছেলেমানুষ তা বুঝতে পারবিনে কিন্তু এসব তুচ্ছ কথা কি এখনও তোর প্রাণে জাগেমায়ে-ছেলেয় যে কত আদর-আবদার হয় বাপ!অবিশ্যি আমার এও মনে পড়ে যেতুই যখন অনবরত বকর-বকর করে আমাদের সংসারী লোকের পক্ষে নিতান্তই অস্বাভাবিক কথাগুলো বকে যেতিস আর নিজের ভাবে নিজেই মশগুল হয়ে পড়তিসতখন আমি হয়তো বিরক্ত হয়ে উঠে অন্য কাজে যেতামতোর কিন্তু কথার ফোয়ারায় ফিং ফুটে যেত তোদের ছেলে-পিলের দলে কী আর আমাদের মতো সেকেলে মরুব্বিদের বসে থাকা মানায়? – রবু বলে কীএই সবে তোর মনে বড্ড কষ্ট হত সত্যি কি তাইরবুর মতো বোকা ছেলে তো আর তুই নোস যেএইসব মনে করে আমায় কষ্ট দিবি!

তোরা এইসব ছেলে-মেয়েগুলোই তো আমাদের দুশমন মা-দের যে কত জ্বালায় জ্বলতে হয়কী চিন্তাতেই যে দিন কাটাতে হয়তা যদি ছেলেরা বুঝত তা হলে দুনিয়ার মা-রা ছেলেদের খামখেয়ালির জন্য এত কষ্ট পেত নাউঃহাড় কালি হয়ে গেল রেহাড় কালি হয়ে গেল!এখন দিনরাত খোদার কাছে মুনাজাত করছিকখন তোকে আবার  যমের মুখ থেকে সহি সালামতে ফিরিয়ে আনেন কী পাগলামিই না করলিএকবার ভেবে দেখ দেখি
খুব ভালো করে থাকিসখাবার-দাবার খুব কষ্ট হচ্ছে বোধ হয় সেখানে ? আমাদের পোড়া মুখে যে আহার রুচে নাখেতে গেলেই মনে হয়, – আহাছেলে আমার কোন্ বিদেশে হয়তো না খেয়ে না দেয়ে পড়ে আছেআর আমি হতভাগি মা হয়ে ঘরে বসে বসে রাজভোগ গিলছি অমনি চোখের জলে হাতের ভাত ভেসে যায়!জলদি চিঠি দিস আর সেখানকার সব কথা জানাস

বাকি সব রবুর চিঠিতে জানবি আর লিখতে পারচিনে তারা কেউ তোর চিঠি পড়ে আমায় শুনায় না নিজে কী যে ছাই-পাঁশ লেখে দু-দিন ধরেতাও জানায় না আমার হাত কাঁপেতবু নিজেই লিখলাম চিঠিটা কী করি বাবামন যে বালাইকিছুতেই মানে না তাছাড়া আমিও মুরুক্ষুর মেয়ে নইআমার বাপজি (আল্লাহ্ তাঁকে জিন্নত থেকে নসিব করুনমৌলবি-মৌলানা লোক ছিলেনতাঁর পায়ের এতটুকু ধুলো পেলে তোরা বত্তিয়ে যেতিস!

 … ইতি
শুভাকাঙ্ক্ষিণী
তোর মা

বাঁধনহারা – (পরিচ্ছেদ ৩) ...>



0 comments:

Post a Comment